এইচআরএসএসের প্রতিবেদন
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ১৭ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ১১ হাজার ২২৯ জন। এ ছাড়া মব সহিংসতা বা গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২৫৯ জন।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায়। ১৫টি জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদন ও নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে সারাদেশে এক হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ, কমিটি নিয়ে বিরোধ ও চাঁদাবাজির কারণে এসব ঘটনা ঘটে। নিহত ১৯৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১৩৪ জন ও আওয়ামী লীগের ২৬ জন রয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াতের ৫ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন, চরমপন্থী দলের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১ জন রয়েছেন। বাকি ১৯ জনের রাজনৈতিক পরিচয় জানা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৫৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে সাতজন নিহত এবং এক হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ৩৪৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৯ হাজার ৭৭২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষকে। বিভিন্ন মামলায় ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ৫৫ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে ৪১৩টি গণপিটুনির ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি ও ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে এসব ঘটনা ঘটে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে ৮৩৪ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন নিহত ও ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন। ৩৩ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৪১টি মামলায় ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও সংঘর্ষে ৬০ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ২২ জন নির্যাতনে ও ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ ছাড়া কারাগারে অসুস্থতা ও নির্যাতনে ১২৭ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩ জনই হাজতি।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এ সময়ে দুই হাজার ৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে এক হাজার ১৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে। পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪৪ জন। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৪৭৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
সীমান্ত হত্যার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএসএফের গুলিতে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১৮৬ জনকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির হামলায় ৩ জন নিহত হয়েছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হয়েছেন। সারাদেশে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
শ্রমিকদের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে বলা হয়, ৫৩১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৬৪ জন নিহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৮ জন শ্রমিক।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম জানান, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি মব সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।