ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৮৬টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৬৯টি আসনে।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৮টি আসনে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে ভোট গণনা শেষে আসনগুলোর বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
সংসদের মোট আসনের অর্ধেকের বেশি আসনে বিজয়ী হলেই তাকে একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য কোন দল বা জোটকে কমপক্ষে ১৫১টি আসন পেতে হবে। সে অনুযায়ী নিশ্চিত করেই বলা যায় যে এবার বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
বিএনপির প্রতি দেশের মানুষের এই সমর্থন জানানোয় কৃতজ্ঞতা ও মোবারকবাদ জানিয়েছে দলটি। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ায় বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনন্দ মিছিল কিংবা কোন সভা করা হবে না।
দলের এই সাফল্যে শুক্রবার ( ১৩ ফেব্রুয়ারী) বাদ জুম্মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও দেশবাসীর প্রতি শুভ কামনায় বিএনপির উদ্যোগে ঢাকাসহ দেশব্যাপী মসজিদে মসজিদে জুম্মার নামাজ শেষে দোয়ার কর্মসূচি পালন করা হবে।
বিএনপির ইতিহাসে সর্বশেষ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল তারা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।
এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া এই দলটিকে বেগম খালেদা জিয়া জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান। দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
তারেক রহমানের অভিষেক ও নেতৃত্ব বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হবেন দেশের পরের প্রধানমন্ত্রী। এবারই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ দুই আসনেই জয়লাভ করেন।
বিগত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। পরে ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। বিএনপির ওয়েবসাইট ও মিডিয়া সেলের তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু।
১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে তিনি তৃণমূল রাজনীতিতে সাড়া ফেলেন। ২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। পরে ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সারাদেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। শেষ হয় বিকেল সাড়ে ৪টায়। এরপর থেকে কেন্দ্রগুলোয় ভোটগণনা চলছে। এদিন সকাল থেকে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার পর ভিড় লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আগামীর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ভোটাররা নিজেদের মতামত দিয়েছেন। এখন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের।
২০০৮ সালে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরুর পর এবারই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ মোট ৫১টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মোট প্রার্থী সংখ্যা দুই হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন ও স্বতন্ত্র ২৭৪ জন। এ ছাড়া নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮০ জন। আর সবমিলিয়ে এবার ১১৯টি নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।