১০ এপ্রিল ২০২৬। জাতীয় সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ পাসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবারও এমন এক আইনগত মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যকার পুরোনো দ্বন্দ্ব নতুন রূপে সামনে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিলটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমন, ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষা ও নাগরিককে অনলাইন প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বহন করছে। কিন্তু বিলটির ভাষা, ক্ষমতার কাঠামো ও প্রয়োগের সম্ভাব্য বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি সাইবার আইন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বিস্তৃত করার একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামোও বটে। সাম্প্রতিক সংসদীয় প্রক্রিয়ায় একাধিক অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই এটি গৃহীত হয়েছে।
যেহেতু বিলটি সংসদে পাস হয়েছে, তাই এটি এখন রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রপতি সই করলেই ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হবে এবং ‘সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬’ কার্যকর হবে।
বাংলাদেশের কালাকানুন ডিজিটাল আইন প্রণয়নের ইতিহাসে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ অধ্যায়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (২০০৬), ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (২০১৮), সাইবার নিরাপত্তা আইন (২০২৩), অন্তর্বর্তী অধ্যাদেশ (২০২৫) এবং হালের সাইবার সুরক্ষা বিল (২০২৬) এসে হাজির হলো জনগণের সামনে।
ইতিহাস বলছে, প্রতিবারই নাম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ বা ‘নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে নাগরিকের কণ্ঠরোধ করার প্রশাসনিক ক্ষমতা কোনো না কোনো ধারায় টিকে থেকেছে।
ইতিহাস আমাদের বলে, প্রতিটি নতুন আইন একটি প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে, আগের আইনের ভুল শুধরে দেওয়া হবে, নাগরিকের উদ্বেগের সমাধান হবে, সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কাঠামোর ভেতরে সেই পুরোনো দর্শনই টিকে থাকে: রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা সামাজিক স্থিতিশীলতার নামে মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত করার ক্ষমতা। আগের আইনগুলো নিয়েও দেশি-বিদেশি পর্যায়ে একই ধরনের সমালোচনা ছিল যে পুরোনো বিতর্কিত ধারাগুলোর সারবস্তু বহাল রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি গণতন্ত্রের নতুন জনপরিসর। যে নাগরিক একসময় তার মতপ্রকাশের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমে জায়গা পেতেন না, তিনি আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন সংবাদপোর্টাল, ভিডিওভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ও স্বাধীন ব্লগের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলতে পারছেন। এই বাস্তবতা ক্ষমতার কাঠামোর জন্য স্বস্তিদায়ক নয়, কারণ অবাধ তথ্যপ্রবাহ দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক অসঙ্গতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে উন্মুক্ত করে দেয়। ঠিক এই জায়গা থেকেই রাষ্ট্রের উদ্বেগ শুরু হয়।
একটি নিয়ন্ত্রণমুখী রাষ্ট্র সবসময় মনে করে, নাগরিকের অবাধ বক্তব্য শাসনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে সরকারের হাতে কালাকানুন নামের আইন তৈরি হয়, প্রকাশ্যে নিরাপত্তার ভাষায়, কিন্তু অন্তর্গতভাবে নিয়ন্ত্রণের যুক্তিতে। এই বিলটিকেও সেই প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর ভাষাগত অস্পষ্টতা। ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ’, ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য’, ‘জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি’, ‘ডিজিটাল অপপ্রচার’—এসব শব্দবন্ধ যদি স্পষ্ট ও সীমিত সংজ্ঞার মধ্যে না থাকে, তবে আইনের ব্যাখ্যার ক্ষমতা কার্যত প্রশাসনের হাতে চলে যায়। এখানেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়ে।
ধরা যাক, কোনো সাংবাদিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন, যেখানে সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, অর্থপাচার বা ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য উঠে এলো। প্রশাসন যদি সেটিকে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তবে সেই প্রতিবেদন সহজেই ফৌজদারি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। ফলে সাংবাদিক সত্য প্রকাশের আগে নিজেই প্রশ্ন করবেন, এই অনুসন্ধানী সংবাদটি কি আমাকে মামলা, হয়রানি বা গ্রেপ্তারের মুখে ফেলবে? এই ভয়ই হলো তথাকথিত চিলিং ইফেক্ট বা শীতল প্রভাব, যেখানে রাষ্ট্র সরাসরি মুখ বন্ধ না করেও এমন পরিবেশ তৈরি করে, যাতে মানুষ নিজেরাই নীরব হয়ে যায়। এই সেলফ সেন্সরশিপ হলো নানা প্রকার সেন্সরশিপের মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিচারিক নজরদারির প্রশ্ন। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পর্যাপ্ত আদালতীয় অনুমোদন ছাড়া ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ, তথ্য তল্লাশি বা ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, তবে তা নাগরিকের গোপনীয়তার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হবে। আজকের পৃথিবীতে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা ক্লাউড অ্যাকাউন্ট কেবল যন্ত্র নয়; এগুলো ব্যক্তিগত জীবন, পেশাগত যোগাযোগ, সাংবাদিকের গোপন সূত্র, আইনজীবীর ক্লায়েন্টের নথি, চিকিৎসকের রোগীর তথ্য—সবকিছুর ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সুতরাং এই ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল ব্যক্তি নয়, পেশাগত স্বাধীনতার ওপরও গভীর আঘাত হানতে পারে। বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলো এই জায়গাতেই মৌলিকভাবে আলাদা। তারা নাগরিককে সবার ওপরে রাখে। তাদের মৌলিক অধিকারকে সর্বোচ্চ অধিকার প্রদান করে।
যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে—রাষ্ট্র এমন কোনো আইন করতে পারবে না, যা মতপ্রকাশ বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করে।
ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের দশম অনুচ্ছেদেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইইউ দেশগুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়। ইউরোপের তথ্য সুরক্ষা কাঠামো নাগরিকের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে সুরক্ষার চেয়ে নাগরিককে সুরক্ষার প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নতুন বিল যদি উল্টোভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গভীর সংকেত বহন করে। এই আইনকে কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের রাজনৈতিক পুনর্গঠন।
রাষ্ট্র কি নাগরিককে বিশ্বাস করছে? নাকি নাগরিকের বক্তব্যকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে? এই প্রশ্নের উত্তরই বিলটির রাজনৈতিক অর্থ নির্ধারণ করবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের মূল দাবি ছিল মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও ভয়মুক্ত মতপ্রকাশের অধিকার। বৈষম্যের দেওয়াল ভাঙতে হলে ভয়মুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
যদি ডিজিটাল পরিসরে সেই অধিকার সীমিত হয়ে যায়, তাহলে এটি কেবল একটি আইনগত পরিবর্তন নয়; এটি গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করবারই নামান্তর। নিরাপত্তা অবশ্যই প্রয়োজন। সাইবার প্রতারণা, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি, অবকাঠামোতে আক্রমণ, নারীর বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা, এসব মোকাবিলায় শক্তিশালী আইন থাকা জরুরি। কিন্তু একটি কার্যকর আইন এবং একটি নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের মধ্যে পার্থক্য হলো উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ। যদি আইনের মূল ফোকাস হয় নাগরিক সুরক্ষা, তাহলে সেটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
আর যদি মূল ফোকাস হয় মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ, তাহলে সেটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করলেও গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। পশ্চিমা আধুনিক বিশ্বে এ ধরনের আইনে সরকার বা রাষ্ট্রকে নয়, নাগরিককে বলিষ্ঠ করে। তাদের কথা বা মতপ্রকাশের অধিকারকে বলবান করে। কিন্তু আমরা বারবারই নাগরিক অধিকারকে খর্ব করার আইন প্রণয়ের দিকে যাই।
সবশেষে প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও নৈতিক, বাংলাদেশ কি একটি নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়তে চায়, নাকি একটি নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল রাষ্ট্র বানাতে চায়? যদি এটি সত্যিকার অর্থে নাগরিক অধিকার, তথ্যের স্বাধীনতা ও বিচারিক নজরদারির ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিরাপত্তার আইন হিসেবে নয়, বরং বাকস্বাধীনতার ওপর আরেকটি দীর্ঘশ্বাস হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]