গোটা বিশ্বের তরুণদের মতো ভারতের তরুণ সমাজও এখন এক অদ্ভুত সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়কে শুধু বেকারত্বের সংকট বললে ভুল হবে। এটি আসলে অপমানেরও সময়। তরুণদের চাকরি নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তার ওপর রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের মানুষদের কিছু মন্তব্য যেন ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে। আর সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির মতো ডিজিটাল ব্যাঙ্গ আন্দোলন।
শুনতে হাস্যকর লাগলেও, এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক প্রতীক। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সম্প্রতি এক শুনানিতে বেকারদের উদ্দেশ্যে তেলাপোকা শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি মূলত কিছু তরুণকে ইঙ্গিত করে বলেন, কাজ না পেয়ে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তিনি ভুয়া সনদধারী কিছু ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করেই মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বক্তব্য আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
ঠিক এরপরই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দ্বীপ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠন করেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এই প্ল্যাটফর্ম কোটি তরুণের সমর্থন পেয়ে যায়। এখন এটি শুধু একটি অনলাইন ব্যঙ্গ নয়, বরং ভারতের হতাশ তরুণদের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদে পরিণত হয়েছে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, তারা অপমানকে উল্টে দিয়ে শক্তিতে পরিণত করেছে। তেলাপোকা সাধারণত ঘৃণার প্রতীক। মানুষ দেখলেই মেরে ফেলতে চায়। কিন্তু তেলাপোকার আরেকটি পরিচয়ও আছে। ভয়ংকর প্রতিকূল পরিবেশেও এটি টিকে থাকতে পারে। অতিকায় ডায়নোসর লোপ পেয়েছে, কিন্তু কোটি বছর পরও তেলাপোকা টিকে আছে। ভারতের তরুণেরা যেন রাষ্ট্রকে বলছে, ‘হ্যাঁ, তোমরা আমাদের তেলাপোকা বলেছ। কিন্তু আমরা এত সহজে হারিয়ে যাব না।’
আর এখানেই অদ্ভুতভাবে ফিরে আসে নব্বই দশকের এক বিশ্ববিখ্যাত গান। প্রয়াত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের সেই ভূবনবিখ্যাত গান দে ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট আস (তারা আমাদের গোনায় ধরে না) আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারণ, ভারতের তরুণদের ক্ষোভের সঙ্গে এই গানের বার্তার বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে।
১৯৯৫ সালে গানটি প্রকাশের সময় আমেরিকাজুড়ে পুলিশি নির্যাতন, বর্ণবাদ, শ্রেণিবৈষম্য আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল। মাইকেল জ্যাকসনের সেই গান যেন তখন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল। গানের কথায় উঠে আসে অবহেলিত মানুষের ক্ষোভ, তারা আমাদের গোনায় ধরে না।
গানটির ভিডিওতে দেখা যায় বস্তির শিশু, কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ, কারাগারের মানুষ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার সাধারণ জনগণ সবাই যেন একই ভাষায় প্রতিবাদ করছে। বিশেষ করে ব্রাজিলের দরিদ্র ফাভেলা এলাকায় ধারণ করা অংশগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তখন অনেকেই বলেছিলেন, মাইকেল জ্যাকসন শুধু সংগীত করেননি; তিনি আসলে পৃথিবীর বঞ্চিত মানুষের গল্প বলেছেন। তিনি গানে গানে বলছেন, আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই যে, তারা (ক্ষমতাবানরা) সত্যিই আমাদের পরোয়া করে না।
ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি আর সেই গানের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো দুটোই ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। একদিকে মাইকেল জ্যাকসন গান দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের কথা কেউ শোনে না। তারা আমাদের গণ্য করে না।’ অন্যদিকে ভারতের তরুণেরা ব্যঙ্গ, মিম আর ডিজিটাল ভাষায় একই বার্তা দিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এখন প্রতিবাদের ভাষা বদলে গেছে। আগে মানুষ শুধু রাস্তায় নেমে স্লোগান দিত। এখন একটি মিম, একটি ব্যঙ্গচিত্র বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। এরকম একটি ব্যঙ্গ আন্দোলন থেকে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পারে। নতুন প্রজন্ম বুঝে গেছে, ডিজিটাল দুনিয়াই এখন সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র।
এই ধরনের প্রতিবাদের উদাহরণ পৃথিবীর আরও অনেক দেশে দেখা গেছে। আরব বসন্তের সময় মিসর আর তিউনিসিয়ার তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আন্দোলনের অস্ত্র বানিয়েছিল। হংকংয়ের তরুণেরা ছাতা হাতে রাজপথে নেমে বলেছিল, ‘আমাদের কথা শুনুন।’ যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে পুলিশি সহিংসতার প্রতিবাদে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি আন্দোলনের কেন্দ্রেই ছিল একই প্রশ্ন, ‘রাষ্ট্র কি আমাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করে?’
ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন সেই একই প্রশ্ন তুলছে। তারা শুধু চাকরি চাইছে না। তারা সম্মান চাইছে। তারা বলতে চাইছে, ‘আমরা শুধু পরিসংখ্যান না, আমরা মানুষ।’
মাইকেল জ্যাকসনের গান আজও তাই পুরনো হয়ে যায়নি। কারণ পৃথিবী বদলালেও বৈষম্য বদলায়নি। শুধু তার রূপ পাল্টেছে। আগে হয়তো পুলিশের বুট ছিল আতঙ্কের প্রতীক, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল নজরদারি, বেকারত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আর মানসিক চাপ। কিন্তু অনুভূতিটা ওই একই, ‘আমাদের কথা কেউ শুনছে না, আমাদের কেউ গণ্য করছে না।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আজকের তরুণেরা আর আগের মতো ভয় পায় না। তারা জানে, সরাসরি সংঘর্ষ সবসময় সম্ভব নয়। তাই তারা ব্যঙ্গকে তাই অস্ত্র বানায়। হাসির আড়ালে ক্ষোভ লুকিয়ে রাখে। মিমকে স্লোগানে পরিণত করে। কারণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই হাসিকে, যেটি তাকে বিদ্রূপ করে।
হয়তো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কয়েক মাস পর আর থাকবে না। হয়তো এটি কোনোদিন রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে না। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে গেছে, নতুন প্রজন্ম আর শুধু বক্তৃতা শুনে চুপ করে থাকবে না। তারা নিজেদের ভাষায় প্রতিবাদ করবে। কখনো গান দিয়ে, কখনো ব্যঙ্গ দিয়ে, কখনো তেলাপোকার মতো কিছুকে প্রতীক বানিয়ে।
আর সেই কারণেই পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের সেই বিপ্লবী গান আবারও নতুন হয়ে ফিরে আসবে। কারণ পৃথিবীর নানা প্রান্তে এখনো যে অসংখ্য তরুণ একই অনুভূতি নিয়ে বেঁচে আছে, বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তেলাপোকার জীবন যাপন করছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]