ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, আমাদের প্রজন্মের কাছে এটি ছিল এক ধরনের ধর্ম, এক রকম সম্মিলিত উন্মাদনা। বিশ্বকাপ এলেই মনে হতো পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা, বিভাজন, তর্ক-বিতর্ক যেন একটি গোল বলের চারপাশে এসে থমকে গেছে। ওই সময়ে রাজনৈতিক দল, সামাজিক পরিচয় কিংবা পেশার মানুষ হিসেবে নয়, বরং আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি অথবা ইতালির সমর্থক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।
আজকের প্রজন্ম লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার, কিলিয়ান এমবাপ্পেকে, আর্লিং হলান্ড বা হ্যারি কেইনকে নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্কে মেতে ওঠে। তাদের দেখে নিজের কৈশোরের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। পার্থক্য শুধু এই যে, তাদের হাতে স্মার্টফোন আর আমাদের সামনে ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সাদাকালো একটা পর্দা।
১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আমার কাছে শুধুই একটি টুর্নামেন্ট ছিল না, সেটি ছিল এক আবেগের রূপকথা। ড্যানিয়েল পাসারেলা, মারিও কেম্পেস, অস্কার অর্টিজ ও ড্যানিয়েল বের্তোনিদের খেলা দেখে আমি আর্জেন্টিনার প্রেমে পড়ে যাই, প্রথম প্রেম যাকে বলে। তখনও দেখা মেলেনি দিয়েগো ম্যারাডোনার বুটজোড়া। সেই বিশ্বকাপটি যেন পুরোপুরি মারিও কেম্পেসের ছিল। তিনি মাঠে নামতেন, আর গোল করতেন; দলকে টেনে নিয়ে যেতেন, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম।
তারপর ১৯৭৯ সালে জাপানে যুব বিশ্বকাপে আবির্ভূত হলেন এক কোঁকড়ানো চুলের কিশোর—দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। সেই কিশোরই পরে ১৯৮৬ সালে ফুটবলকে শিল্পে এবং নিজেকে কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। তাই অনেকেই বলেন, ১৯৭৮ ছিল মারিও কেম্পেসের বিশ্বকাপ, আর ১৯৮৬ ছিল এককভাবে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ।
আমাদের ফুটবল দেখার গল্পটাও ছিল বেশ অদ্ভুত। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আমরা বিশ্বকাপ দেখেছি সাদাকালো টিভিতে। আজকের ছেলে-মেয়েরা হয়তো বিশ্বাসই করবে না যে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি কিংবা ইতালির নীল জার্সি—সবই আমাদের চোখে ধূসর রঙের মত ছায়া হয়ে ধরা দিত। ছাদের ওপর অ্যান্টেনা ঘোরানোর জন্য একজন থাকত, আর নিচ থেকে আরেকজন চিৎকার করে বলত, ‘এই-এই, এখন পরিষ্কার... না না, আবার ঝাপসা হয়ে গেছে!’
সেই সময়ের ফুটবল নায়করা ছিলেন আমাদের কল্পনার রাজ্যের অধিবাসী। জার্মানির কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে, রোমানিয়ার গিওর্গি হ্যাজি, হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ডের) রুড গুলিট ও মার্কো ভ্যান বাস্তেন, জার্মানির লোথার ম্যাথাউস, ফ্রান্সের মিশেল প্লাতিনি; তারা ছিলেন ফুটবল বিশ্বের ধ্রুবতারা কিংবা নক্ষত্র। আর ব্রাজিল ছিল যেন ফুটবলের গীতি-কবিতা। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও, জুনিয়র; পরে রোমারিও, বেবেতো, রোনালদো ফেনোমেনো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা! তাদের খেলা দেখলে মনে হতো বল পায়ের কাছে নয়, বরং বাঁশির সুরের মতো তাদের আদেশ মেনে চলছে।
এরপর বিশ্ব জানুল ডেভিড বেকহ্যামের বাঁকানো ফ্রি-কিক, জিনেদিন জিদানের রাজকীয় ফুটবল শিল্প, রোনালদিনিয়োর হাসিমাখা মাঠের জাদু, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাস এবং লিওনেল মেসির অলৌকিক শিল্পকর্ম। ফুটবল বদলেছে, প্রযুক্তিও বদলেছে; খেলা দেখার মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু ফুটবলের প্রেম বদলায়নি।
আজ ১০ জুন ২০২৬, বিশ্বকাপের আরেকটি মহাযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পর, শুরু হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব, দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। ইতিহাসের প্রথম তিন দেশ আয়োজিত এই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে, যেখানে স্বাগতিক মেক্সিকো মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত প্রায় ১২টায়।
ভাবতেই অবাক লাগে, একসময় আমরা সাদাকালো টিভির সামনে বসে কেম্পেসকে দেখেছি, তারপর ম্যারাডোনার জাদু দেখেছি। আর আজও বিশ্বকাপ এলে সেই একই রকম উত্তেজনা বুকের ভেতর ধুকপুক করে। কারণ? ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি স্মৃতির ভাণ্ডার, আবেগের ভাষা এবং প্রজন্মকে প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। তাই তো ইংরেজিতে বলে, ফুটবল ইজ মোর দ্যান এ গেইম!
ফুটবলকে আমি অনেকটা আকাশের সেই চিরন্তন নক্ষত্রমালার সঙ্গে তুলনা করতে পছন্দ করি। একেক সময় একেক নক্ষত্র সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়ায়। কখনো মারিও কেম্পেস, কখনো ম্যারাডোনা, জিদান কিংবা লিওনেল মেসি। কিন্তু আকাশ যেমন নক্ষত্রহীন হয় না, তেমনি ফুটবলও কখনো নায়কবিহীন থাকে না। নক্ষত্রের মৃত্যু হয়, যুগ বদলে যায়, পরিস্থিতিতে মানুষ বদলায়; কিন্তু আকাশ রয়ে যায় চিরন্তন। আর সেই আকাশের দিকেই যুগে-যুগে কোটি ফুটবলপ্রেমী বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে ফুটবল বিশ্বকাপে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও নীতি বিশ্লেষক