খুব অমানবিক, হিংস্র এবং অনুভূতিহীন একটি প্রজন্ম নীরবে আমাদের সমাজে বেড়ে উঠছে আর আমরা যেন নির্বিকার দর্শকের মতো তা দেখেও না দেখার ভান করছি।
আমাদের অজান্তেই এমন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যাদের হৃদয় থেকে ধীরে ধীরে নির্বাসিত হচ্ছে মায়া, মমতা, প্রেম ও ভালোবাসা। সহমর্মিতার জায়গা দখল করে নিচ্ছে নির্মমতা। মানুষের কান্না, যন্ত্রণা ও অসহায়ত্ব তাদের কাছে ক্রমশ বিনোদনের উপাদানে পরিণত হচ্ছে। নিষ্ঠুরতা তাদের আর বিচলিত করে না; বরং অনেকের কাছে তা কৌতূহলের, কখনও কখনও উপভোগের বিষয় হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই পরিবর্তনটি হঠাৎ ঘটছে না। প্রতিদিন, একটু একটু করে মানবিকতার মৃত্যু ঘটছে, অথচ সেই মৃত্যুর আর্তনাদ আমাদের কানে পৌঁছায় না। আমরা ব্যস্ত, উদাসীন, কিংবা হয়তো এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে বিবেকের নীরব চিৎকারও আর আমাদের স্পর্শ করে না।
একটি সভ্যতা তখনই সবচেয়ে বড় সংকটে পড়ে, যখন মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যে সমাজে করুণাকে দুর্বলতা, সহানুভূতিকে অপ্রয়োজনীয় আবেগ, আর নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে মেনে নেওয়া হয় সেই সমাজের ভবিষ্যৎ কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।
এখনও সময় আছে। আমাদের সন্তানদের শুধু প্রতিযোগিতায় জিততে নয়, মানুষ হতে শেখাতে হবে। শুধু সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নয়, অন্যের ব্যথা অনুভব করার শক্তিও গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রযুক্তি, জ্ঞান, ক্ষমতা কিংবা সম্পদ সবকিছুই অর্থহীন, যদি মানুষের ভেতর থেকে মানুষটিই হারিয়ে যায়।
পাদটীকা: আমার দৃষ্টিতে, এই মানবিক অবক্ষয়ের পেছনে অন্যতম বড় কারণ আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের দুর্বৃত্তায়িত ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যখন রাজনীতিতে সহিংসতা, প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন তার বিষাক্ত ছায়া ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই ছায়াতেই বেড়ে ওঠে এমন এক প্রজন্ম, যারা মানবিকতার চেয়ে নিষ্ঠুরতাকে বেশি স্বাভাবিক বলে মনে করতে শুরু করে।
লেখক
মোস্তাফিজুর রহমান টিটো
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, নাগরিক প্রতিদিন