সংসদ মানেই তর্ক, বিতর্ক আর ভোটাভুটি। কিন্তু কখনও কখনও হঠাৎ করেই বদলে যায় দৃশ্য, বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে উঠে দাঁড়িয়ে কক্ষ ত্যাগ করেন। মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো সংসদে। এই ঘটনাই ‘পার্লামেন্টারি ওয়াকআউট’—একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল।
ওয়াকআউট আসলে কী? খুব সহজভাবে, সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত, বিল বা বক্তব্যের প্রতিবাদে সদস্যদের সভাকক্ষ ত্যাগ করাই হলো ওয়াকআউট। এটি মূলত বিরোধী দলের হাতিয়ার। তাদের লক্ষ্য, সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা, জনমত গড়ে তোলা এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা।
তবে এটি শুধু প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, অনেক সময় কৌশলগত অস্ত্রও। একসঙ্গে অনেক সদস্য বেরিয়ে গেলে সংসদের কোরাম ভেঙে যেতে পারে। তখন গুরুত্বপূর্ণ ভোট বা সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়ে যায়—যা সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করে।
বিশ্বজুড়ে এই কৌশল বহুল ব্যবহৃত। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন বিল, বক্তব্য বা রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে একাধিকবার ওয়াকআউট হয়েছে। সম্প্রতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের জন্য জারি করা অধ্যাদেশসহ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করা সংক্রান্ত বিলের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল।
এসব বিলের উপর আলোচনায় দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছে সংসদ। যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তিসত্ত্বেও রহিতকরণ বিলগুলো জনমত যাচাইয়ের জন্য গ্রহণ না করে পাস করার প্রতিবাদে সংসদ থেকে ঘোষণা দিয়ে ওয়াক আউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। এর আগে অধ্যাদেশ রহিতকরণ সব বিলেই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) আছর নামাজের বিরতির পর স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিল পাসের পর সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, বিরোধীদলের যৌক্তিক বাধা স্বত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। তাই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি। তার নেতৃত্বে জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে তিনি অধিবেশন থেকে বের হয়ে যান।’
এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টেও ও ঘটে থাকে। ভারতে এটি প্রায় নিয়মিত ঘটনা, লোকসভা বা রাজ্যসভায় বিতর্কিত ইস্যু উঠলেই বিরোধীরা স্লোগান দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করেন। পাকিস্তানেও সরকারের নীতির প্রতিবাদে এমন দৃশ্য নতুন নয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যে তুলনামূলক কম হলেও ওয়াকআউটের নজির রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি কখনও নাটকীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, ২০১১ সালে ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে বিরোধী আইনপ্রণেতারা একটি বিল ঠেকাতে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যান, যাতে কোরামই না হয়।
তবে ওয়াকআউট নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত ওয়াকআউট সংসদের মূল উদ্দেশ্য, আলোচনা ও সমাধান দুর্বল করে দেয়। কিন্তু সমর্থকদের যুক্তি ভিন্ন। তারা বলেন, যখন বিরোধীদের কথা বলার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়, তখন ওয়াকআউটই হয়ে ওঠে তাদের শেষ ও সবচেয়ে জোরালো রাজনৈতিক ভাষা।
অর্থাৎ, সংসদের ভেতরের এই হঠাৎ নীরব প্রতিবাদ আসলে ক্ষমতার লড়াইয়েরই আরেক রূপ, যেখানে কক্ষ ছাড়াও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।