বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। তিনি ছাত্রজীবনে মুসলিম লীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে রূপান্তরিত করে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
বলা হয়, শেখ মুজিব মুসলিম লীগের মধ্য দিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলেন, কিন্তু পরে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বাঙালির ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।
শেখ মুজিব কেন মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন, তা নিয়েও বিভিন্ন সময় বিশ্লেষণ হয়েছে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক খুরশিদা বেগম। তিনি বলেন, অল্প বয়সে মুসলিম লীগের প্রভাব ছিল স্বাভাবিক। তবে অল্প সময়েই মুজিবের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনার জন্ম হয় এবং মুসলিম লীগের সঙ্গে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শেখ মুজিবের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে। তার মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রভাব একটা বড় কারণ ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও তার ‘অসমাপ্ত আত্নজীবনী’ বইয়ে সেই প্রেক্ষাপট লিখেছেন।
মুজিব লিখেছেন, ১৯৩৮–৩৯ সালে গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় এবং পরবর্তীতে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন শেখ মুজিবকে রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক চিন্তা লালন করেননি। ১৯৪৬ সালের কোলকাতার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়ও তিনি দাঙ্গার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়েই মানুষের প্রত্যাশা ও মোহভঙ্গ উপলব্ধি করে শেখ মুজিব মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পথে হাঁটতে শুরু করেন। খুরশিদা বেগম বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের শোষণ, ভাষা আন্দোলন ও হিন্দু-মুসলিম সবার অধিকারের প্রতি মনোযোগ তাকে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে নিয়ে যায়।
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, মুসলিম লীগের বিরোধী দল গঠনের ছয় বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দলের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিতে প্রস্তাব দেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার ইশতেহারেও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানেও ধর্মনিরপেক্ষতা স্বাধীন বাংলাদেশের মূলনীতি হিসেবে প্রতিস্থাপিত হয়।
রাজনীতিক পংকজ ভট্টাচার্যের মতে, বাস্তবতা, সময় ও মানুষের প্রয়োজন শেখ মুজিবকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির নেতা হিসেবে তৈরি করেছিল। মুসলিম লীগে প্রবেশের পর তিনি নিজেকে রূপান্তরিত করে ধর্মনিরপেক্ষতার স্থপতি হন। তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সাধারণ মানুষকে তার দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।