ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে অংশ নিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে শুক্রববার (১০ এপ্রিল) পর্যন্ত ৮০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এদের সবাই নিজেদেরকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্র বিতরণের প্রথম দিনে ৫২ জন ও দ্বিতীয় দিনে আরও ২৮ জন প্রার্থী ফরম সংগ্রহ করেন। দুই দিনে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০ জনে। উল্লেখ্যযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন নিপুণ রায় চৌধুরী, শাম্মী আক্তার শাম্মি ও সৈয়দা সাবরিনা সিদ্দিক।
এর আগে বৃহস্পতিবার ফরম নেওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—ফারজানা রশিদ লাবনী, মোসা. নিলুফা ইয়াসমিন খান, তাহমিনা বেগম রিপা, রোকেয়া চৌধুরী বেবী, কাজী নাজিয়া হক, মোছা. জিনাত আরা আফু, কাজী মরিয়ম বেগম, হাফেজা ফেরদৌস লিমন, তাহমিনা খান, অ্যাডভোকেট তহমীনা আক্তার হাসেমী, রেহেনা পারভীন, সানসিলা জেবরিন, আইরিন মাহবুব, সেলিনা আফরোজ, ডা. নাছিমা তালুকদার, জেসমিনা খানম, মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন (ডেরা), সেলিনা পারভীন, হাবিবা আক্তার পাপিয়া, অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার সানজি, ড. নাছিমা ইসলাম চৌধুরী দৃষ্টি, খাদিজা বেগম, মাহমুদা সুলতানা ও নিলুফার চৌধুরী মনি।
সাবরিনা সিদ্দিক জানান, তার শ্বশুর দীর্ঘদিন এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তিনি নিজেও স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও দলের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
অন্যদিকে নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, তিনি নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পাশাপাশি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকেও দলীয় ফরম নিয়েছেন। ঢাকা থেকে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত জামায়াত বা অন্যান্য জোটের পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি।
পল্টনে সরব বিএনপি কার্যালয়
এদিকে সংরক্ষিত নারী আসনের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। শুক্রবার সকাল থেকে ফরম বিক্রি কার্যক্রম শুরু হলে বিভিন্ন পেশা ও পটভূমির নারী প্রার্থীরা সেখানে ভিড় করেন।
প্রথমে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক কাজী আসাদুজ্জামানের সহধর্মিণী ইয়াসমিন আসাদের হাতে মনোনয়ন ফরম তুলে দেওয়া হয়। পরে একে একে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জেরিন দেলোয়ার হোসেন, কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন, আরিফা সুলতানা রুমা, নিপুণ রায় চৌধুরী ও সানজিদা তুলি।
বিএনপি নেত্রী শেগুফতা রাব্বানী ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। মৌলভীবাজারের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এদিকে লক্ষ্মীপুরের রাজনীতিতে আলোচনায় উঠে এসেছে অধ্যাপক রোকেয়া চৌধুরী বেবীর নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ক্ষেত্রে সক্রিয়তা ও তৃণমূল পর্যায়ে সম্পৃক্ততার কারণে তাকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৮ বছর রাজপথে সংগ্রাম করেছি। নানা ধরনের হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আশা করছি, দল আমাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।’
শুক্রবার মনোনয়ন ফরম তুলেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মেয়ে ডা. খন্দকার আখতারা খাতুন লুনা। আলোচনায় থাকা এই বিএনপি নেত্রী জানান, তিনি তার বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোটবেলা থেকে বিএনপি করেন। তিনি আরও বলেন, ‘সর্বপরি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের পথ প্রদর্শক। তার দর্শণ নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাব। আমার জীবন বিএনপিকে ঘিরে, আমার মন বিএনপিকে নিয়ে। আমার এলাকা মানিকগঞ্জের মানুষজন চায় আমি সংসদ সদস্য হই। এক-এগারোর কঠিন সময়ে খন্দকার দেলোয়ার হোসেন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন।’ ওই সময়ের কথা বলতে গিয়ে লুনা ও তার ছোট ভাই খন্দকার আকতার হামিদ পবনকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে দেখা যায়।
বিকেল ৪টা পর্যন্ত মোট চার শতাধিক ফরম বিক্রি হয়েছে বলে বলছেন বিএনপির সহ দপ্তর সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তেনজিং। এর আগে শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্য থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী বেছে নেওয়া হবে। প্রার্থী নির্বাচনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে—জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জাতীয় সংসদে কার্যকরভাবে কথা বলার সক্ষমতা।
আগ্রহী প্রার্থীরা আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন। প্রতিটি ফরমের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার টাকা এবং জমা দেওয়ার সময় জামানত হিসেবে দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ৩৬টি পাবে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা। এই জোটে রয়েছে গণ অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। এবার জোটবদ্ধ নির্বাচনের কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা করছে না ইসি। তবে একই পার্টি থেকে নির্ধারিত সংখ্যার অধিক প্রার্থী থাকতে পারে। তা নিশ্চিত হবে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ আগামী ২১ এপ্রিল। রিটার্নিং অফিসার মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ ২২ ও ২৩ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভবনে করবেন। যদি কেউ আপিল করার ইচ্ছা পোষন করেন তবে তিনি ২৬ এপ্রিল আপিল আবেদন করতে পারবেন। আপিল নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ এপ্রিল। প্রতীক বরাদ্দ হবে ৩০ এপ্রিল। আর ১২ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।