বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১৮০ দিনে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তার দাবি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ—সরকারের নির্ধারিত এই তিন অগ্রাধিকারেই ব্যর্থতা স্পষ্ট।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি নিজেদের মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। এ সময় তারা একটি প্রেস ব্রিফিং করার পাশাপাশি ই-বুকও প্রকাশ করেছে। তবে তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, সরকার দেশের বিভিন্ন সংকট নিয়ে নিজেদের সাফল্যের কথা বললেও এসব বিষয়ে তাদের যথাযথ জবাবদিহি নেই।
নাহিদ বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার আগামী ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। এগুলো ছিল নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। কিন্তু বাস্তবে তিন ক্ষেত্রেই সরকার কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
দ্রব্যমূল্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত কয়েক মাসে কেজিপ্রতি বা এককপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। তার অভিযোগ, বাজারে পণ্য সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চ-এপ্রিলে দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে পেট্রোল ও ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। জ্বালানি নিতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়াতে হয়েছে। সে সময় সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী সংকটের কথা অস্বীকার করে এটিকে পরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নাহিদ বলেন, সংকটের কারণ অনুসন্ধান ও সমাধানের জন্য পরে জাতীয় সংসদে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তবে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ তার।
তার দাবি, ওই সময় জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ায় পরিবহন খরচের পাশাপাশি সেচ ও কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জ্বালানি সংকটের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে জ্বালানি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি তার।
সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে প্রভাবশালী ও অনভিজ্ঞ গোষ্ঠীর প্রবেশের অভিযোগ তুলে নাহিদ বলেন, এসব গোষ্ঠী উচ্চ কমিশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার কাছে পাইকারি পর্যায়ে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ পেয়েছে। এতে জ্বালানি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পাম্পে জ্বালানি মজুত করে রাখার ঘটনাও তারা দেখেছেন বলে জানান তিনি।
তার অভিযোগ, সরকার এখনো ওই জ্বালানি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
নাহিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট বা ৪৩ শতাংশ।
তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকার মতো শহরেও অনেক এলাকায় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত রান্নার চুলা জ্বলছে না। বিদ্যুৎ সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ছে।
শিল্প খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে নাহিদ বলেন, কারখানাগুলো স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এত বড় ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বরং সংকটের সুযোগ নিয়ে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হয়ে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।