জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াত সরকার ক্ষমতায় গেলে নাহিদ ইসলামকে মন্ত্রী করা হবে। রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা-১১ আসনের ভোটারদের উদ্দেশ্যে আয়োজিত জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নাহিদ ইসলামের জন্ম এখানে, বেড়ে ওঠা এখানে। তাই মায়ের কাছে মাসির গল্প করব না। সরকার গঠন করতে পারলে নাহিদ ইসলামকে মন্ত্রী হিসেবেই আপনারা দেখবেন, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, আমরা ৪৭ দেখি নাই শুনেছি, ৭১ দেখেছি আর ২৪ আমরা পেয়েছি। ৪৭-এ যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, ৭১-এ হুবহু তাই ছিল। ২৪-এ সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ৪৭-এর পরে ২৩ বছর জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, ৭১-এর পরে ৫২ বছর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। এখন ৫৪ অতিক্রম হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ২৪-এ আমাদের যুবসমাজ, ছাত্র-ছাত্রীরা বিশাল কোনো দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেনি। তাদের একটি ন্যায্য দাবি, অতি সাধারণ একটা দাবি নিয়ে নেমেছিল— ওটা সংস্কারের আন্দোলন। কিন্তু অতীতের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দায় এ আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জুলাই মাসে আন্দোলন দানা বাঁধে, জুলাই ১৫ তারিখে আন্দোলন জ্বলে ওঠে। ১৫ তারিখ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ওপর যখন হাতুড়ি বাহিনী আঘাত করেছিল, সারা বাংলাদেশ একসঙ্গে জ্বলে উঠেছিল।
তারপরের দিন ১৬ তারিখ, উত্তরবঙ্গের এক সিংহপুরুষ— আমাদের গর্ব, অহংকার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ রাস্তায় নেমে বলেছিল, হয় আমার অধিকার দে, না হয় আমাকে একটা গুলি দে। সে বুক পেতে দাঁড়িয়ে বলেছিল— বুকের ভেতর তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর। রাস্তা ছাড়েনি, বীরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। এক-দুই-তিন, পরপর তিনটি গুলি করে তাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু, একটা গুলিও সে পিঠে নেয়নি, তিনটা গুলি সে বুকে নিয়েছে। এটিই বীরের পরিচয়। আমরা তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। একই দিনে তার আরও পাঁচজন সহকর্মী দেশের বিভিন্ন জায়গায় শাহাদত বরণ করেন। আস্তে আস্তে এভাবেই রক্তাক্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠল।
যুবকদের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমির বলেন, তোমরা তৈরি হয়ে যাও বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য। আজকে যে নাহিদ ইসলামকে এখানে আমরা প্রার্থী করেছি— এই নাহিদ ইসলাম ইনশাল্লাহ আগামীতে বাংলাদেশ নামের উড়োজাহাজ যেটা, ওটার ককপিটে ওদেরকে পাইলট হিসেবে, ক্যাপ্টেন হিসেবে বসাব। আর আমরা গিয়ে পিছনের সিটে প্যাসেঞ্জার হিসেবে বসব। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে এরা নিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না। এদেশের মানুষ মেধাবী এবং পরিশ্রমী। অতীতের নেতৃত্বের মধ্যে সততার অভাব ছিল, তাদের মধ্যে দুর্নীতি থেকে হাতকে মুক্ত রাখার সেই শপথ ছিল না, দেশের প্রতি দায় ছিল না—এজন্যই বাংলাদেশ আগাতে পারেনি। আমরা আশা করব যুবকেরা আমাদেরকে হতাশ করবে না ইনশাল্লাহ। তারা আমাদেরকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, আজকে একজন যথার্থই বলেছেন এখানে দুইজন প্রার্থী আছেন, দুইজনকে আপনারা চেনেন। আমার চাইতে নাহিদকে আপনারা ভালো চেনেন। কিন্তু এটা বলতে চাই— ইনশাল্লাহ ইনসাফের বাংলাদেশের পক্ষে জনগণের রায় আল্লাহর মেহেরবানিতে যদি অর্জিত হয়, তাহলে সেই সরকারে অবশ্যই নাহিদ ইসলামকে আপনারা একজন মন্ত্রী হিসেবে দেখবেন। আমরা হাতে হাত ধরে একসঙ্গে কাজ করব। তবে শুধু ১১ আসনের জন্য নয়, আমরা বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতি ইঞ্চি মানুষ আর ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যেকের হকের ওপরে আমরা পাহারাদারি করব ইনশাল্লাহ। কারো সঙ্গে আমরা বেইনসাফি করব না।
জামায়াত আমির বলেন, এই এলাকা ঢাকার অন্তর্ভুক্ত, রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। জর্জরিত ওই কারণে— যেই সমস্যাগুলো সমাধান করতে গিয়ে দেশের টাকা বিদেশে চলে গেছে; কোনটা কানাডা, কোনটা সিঙ্গাপুর, আর গড়ে উঠেছে সুরম্য বেগমপাড়া। আমরা যদি সেই টাকাগুলো ফিরিয়ে আনতে পারি আর আগামীতে আর কোনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত যদি দেশের টাকা লুণ্ঠনের সেই দুঃসাহস না দেখায়, বাংলাদেশ হুঁ হুঁ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। এই জাতির ভাগ্য বদলের জন্য পাঁচটি বছর আমরা মনে করি যথেষ্ট, এরপরে বাংলাদেশ রাস্তা খুঁজে পেয়ে যাবে এবং সেই মহাসড়ক ধরে ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে।
জামায়াত আমির আরও বলেন, আমরা আপনাদেরকে ওরকম কোনো আশ্বাস দেব না এখানে—যেটা আছে তাই দেবো, যেটা নাই ওটা অন্যভাবে বলব না। আমরা কোনো ভুল আশ্বাসে নাই। যা বলব ইনশাল্লাহ আল্লাহর ওপর ভরসা করে সেইটাই করার চেষ্টা করব জানপ্রাণ দিয়ে। যেভাবে জুলাই এনে দিয়েছে আমাদের সহযোদ্ধারা, জানপ্রাণ দিয়ে সেইভাবে আগামীর দায়িত্ব আমরা পালন করব ইনশাল্লাহ। আসুন একটা বেইনসাফি মুক্ত, জুলুমবাজ মুক্ত, চাঁদাবাজ মুক্ত, দখলবাজ মুক্ত, মামলাবাজ মুক্ত, আধিপত্যবাদ মুক্ত একটা ন্যায়-ইনসাফের মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আল্লাহ আমাদেরকে তৌফিক দান করুন।
যুবকদের হাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব দিতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বেকার ভাতা দিতে চাই না। ২৪-এর যুবকেরা কোথাও গিয়ে কারো কাছে বলেনি— দে দে দে, বেকার ভাতা দে। স্লোগান দিয়েছিল কেউ? আজকে বেকার ভাতা দেওয়া মানে হলো যেই সন্তানেরা সেদিন চিৎকার দিয়ে বলেছিল আমাদের অধিকার দাও, আমাদের হাতে আমাদের ন্যায্য কাজ তুলে দাও— তাদেরকে বেকার ভাতার কথা বলা মানেই হচ্ছে যুবসমাজকে অপমান করা।