স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ছয়বার নির্বাচিত হয়ে, কখনোবা বিতর্কিত ভোটে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া দেশের সব অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনেই দলটির ছিল সরব উপস্থিতি। কখনো জয় পেয়েছে, কখনো প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির কাছে হেরেছে।
দীর্ঘ তিন দশক পর আবারও কোনো সংসদ নির্বাচন থেকে দূরে থাকছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশ না নেওয়ার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৯৬ সালে নির্বাচন বর্জন ছিল তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণেরই সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় দলটিকে। অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তাদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশকে ছাত্রলীগকে করা হয় নিষিদ্ধ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না শেখ হাসিনার দল।
প্রশ্ন উঠেছে, সারা দেশে আওয়ামী লীগের যে সমর্থকগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, এবারের নির্বাচনে তারা কি করবেন? ভোট দেবেন কি তারা?
অনেকের ধারণা, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রেই যাবেন না। কাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাবেন। যারা এই ধারণা পোষণ করেন, তাদের বড় অংশই শহুরে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাদের এই ধারণা মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, জেলা-উপজেলা-তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা গত ১৭ মাস ধরে প্রতিপক্ষের দয়া-দাক্ষিণ্যে এলাকায় আছেন। অনেকেই পলাতক। মামলা-হামলা থেকে বাঁচতে, ঘরে পরিবারের কাছে ফিরতে তাদের ধর্না দিতে হচ্ছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে। এলাকায় পরিবার নিয়ে খেয়েপড়ে থাকতে হলে, মামলা-হামলা থেকে রেহাই পেতে হলে যে প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তাকে ভোট দেওয়া ছাড়া উপায় নেই তাদের, যতই বিদেশে থাকা শীর্ষ নেতারা ভোট বর্জনের ডাক দিক না কেন। নির্বাচন বর্জন করার মতো বাস্তবতা এই সমর্থকদের আসলেই নেই।
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের এই অবস্থা অন্য দলগুলোর অজানা নয়। তাই নির্বাচনী প্রচারের সময় তাদের আকৃষ্ট করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন বিএনপি, জামায়াত থেকে শুরু করে অন্য দলের প্রার্থীরা।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুরের শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তারের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বিজয়ী করার অঙ্গীকার করেন দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের কমপক্ষে ২০ জন নেতা–কর্মী।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রচারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এবার তো নৌকা নেই। নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের যেসব সমর্থক আছেন, তাদের বিপদে ফেলে গেছে। আমরা সেই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের আশ্বস্ত করেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হবে না। গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরও তার নির্বাচনী এলাকায় বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম। আপনাদের একজনেরও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।’
ভোটের এক সপ্তাহ আগে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ যৌথভাবে একটি জরিপের ফল প্রকাশ করে। আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই মতামত জরিপে বলা হয়, আগের নির্বাচনগুলোতে যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, এবার তাদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বিএনপিকে, ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ জামায়াতকে, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেবেন। ১৩ শতাংশ ভোটার অন্যদের ভোট দেবেন। ২ দশমিক ৪ শতাংশ আওয়ামী লীগ সমর্থক এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
দেখার বিষয়, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক কোন দিকে মোড় নেয়। দলটির সমর্থকেরা কেন্দ্রে যাবেন নাকি ভোটদান থেকে বিরত থাকবেন।