টাইম ম্যাগাজিনের নিবন্ধ
চাঁদে প্রতিটি মানববাহী অভিযানের শুরু হয় আগুনে; শেষ হয় জলে। আর্টেমিস-২ এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত ১ এপ্রিল এই মহাকাশযান ও এর নভোচারীরা যাত্রা শুরু করেন। সেই মুহূর্তে মহাকাশযানের ছয়টি রকেট ইঞ্জিন থেকে নির্গত আগুনের শিখা প্রায় ৮৮ লাখ পাউন্ডের শক্তিশালী ধাক্কা তৈরি করেছিল।
এই মিশনের সমাপ্তি ঘটে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে; পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ৮টা ৭ মিনিটে; যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরের উপকূলের অদূরে। তিনটি ১১৬ ফুট ব্যাসের প্যারাস্যুটের নিয়ন্ত্রণে ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় ১৭ মাইল বেগে সাগরের ঢেউয়ের ওপর আছড়ে পড়ে অবতরণ করে।
এর দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে চার নভোচারী কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন নিরাপদে ইউএসএস জন পি মুরথা জাহাজের ডেকে পৌঁছান।
এর মধ্য দিয়ে ৫৪ বছরের মধ্যে চাঁদে প্রথম মানববাহী মিশনের সফল সমাপ্তি ঘটল।
তবে শুক্রবার রাতে নভোচারীদের এই নিরাপদ প্রত্যাবর্তন মোটেও নিশ্চিত ছিল না। তারা এমন এক মহাকাশযানে উড়ছিলেন, যা এর আগে কখনো মানুষ বহন করেনি। এছাড়া তারা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের জন্য এমন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন, যা আগে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি। তাদের সুরক্ষায় থাকা হিট শিল্ড বা তাপ-বর্মটি নিয়েও প্রকৌশলীরা ২০২২ সালের আর্টেমিস-১ মিশনের পর থেকেই চিন্তিত ছিলেন।
পৃথিবীর পথে তাদের মূল প্রত্যাবর্তনের যাত্রা শুরু হয় ৭ এপ্রিল। আর্টেমিস-২ যখন চাঁদের অন্ধকার অংশ প্রদক্ষিণ শেষ করে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যবর্তী ২ লাখ ৫০ হাজার মাইলের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়, তখন থেকে এটি শুরু হয়।
মহাকাশের ওই নির্দিষ্ট বিন্দুতে মহাকাশযানটি চাঁদের তথাকথিত মহাকর্ষীয় প্রভাব অঞ্চল ত্যাগ করে এমন এক অঞ্চলে প্রবেশ করে, যেখানে চাঁদের নিকটবর্তী কিন্তু দুর্বল আকর্ষণের চেয়ে পৃথিবীর দূরবর্তী অথচ শক্তিশালী মহাকর্ষ বল বেশি কাজ করে।
নভোচারীরা যখন সেই বিন্দুতে পৌঁছান, তখন তাদের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ১০০ মাইল। কিন্তু এই গতি নাটকীয়ভাবে বদলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল।
যাত্রার বাকি সময়টিতে নভোচারীরা ঠিক পৃথিবীর দিকে উড়ে আসছিলেন না, বরং বলা যায়, তারা পৃথিবীর দিকে আছড়ে পড়ছিলেন।
পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানে তারা যতই কাছে আসছিলেন, ততই তাদের গতি বাড়ছিল। একপর্যায়ে এই গতি ঘণ্টায় ২৪ হাজার মাইলে পৌঁছায়; যা পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানের গতির চেয়েও ঘণ্টায় ৬ হাজার ৫০০ মাইল বেশি।
পৃথিবীর ঘন বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার জন্য এটি ছিল বিশাল পরিমাণ শক্তি। এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তের জন্য নভোচারীরা শুক্রবার সারাদিন প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাদের কর্মদিবস শুরু হয় পূর্বাঞ্চলীয় সময় বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে, যখন নাসা তাদের ঘুম ভাঙাতে চার্লি ক্রকেটের ‘লোনসাম ড্রিফটার’ গানটি বাজায়।
এর আগের দিনগুলোতে তাদের ঘুম ভাঙানোর প্লে-লিস্টে ছিল সিলো গ্রিনের ‘ওয়ার্কিং ক্লাস হিরোস’, ম্যান্ডিসা ও টোবি ম্যাকের ‘গুড মর্নিং’ এবং কুইন ও ডেভিড বাউয়ির ‘আন্ডার প্রেশার’।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা নভোচারীরা তাদের ১০ দিনের ব্যবহারের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি গুছিয়ে রাখেন। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ক্যাপসুলটি প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে থাকে এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বৃদ্ধি পায়।
ওই সময় কোনো বস্তু যাতে আলগা হয়ে এদিক-ওদিক ছিটকে না যায়, সেজন্য তারা সব কিছু শক্ত করে বেঁধে রাখেন।
শুক্রবার দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে তারা মহাকাশযানের থ্রাস্টারগুলো সচল করেন, যাকে বলা হয় রিটার্ন ট্রাজেক্টোরি কারেকশন ৩ বার্ন। এর মাধ্যমেই তারা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ওপর দিয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে সান ডিয়েগোর কাছে সমুদ্রের জলে অবতরণের সঠিক পথটি নিশ্চিত করেন। বিকেল ৫টার কিছু পরে নভোচারীরা তাদের উজ্জ্বল কমলা রঙের প্রেসার এবং সারভাইভাল স্যুটগুলো (জীবনরক্ষাকারী পোশাক) কোনোমতে পরে নেন এবং পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপটির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
এরপর সন্ধ্যা ৭টা ৩৩ মিনিটে তারা তাদের শঙ্কু আকৃতির ওরিয়ন কমান্ড মডিউলকে চোঙাকৃতির সার্ভিস মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন করেন; যে সার্ভিস মডিউলের ভেতর ছিল মূল ইঞ্জিন এবং চারটি সৌর প্যানেল।
এরপর সন্ধ্যা ৭টা ৫৩ মিনিটে, যখন মহাকাশযানটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ঠিক ৭৬ মাইলের কিছু কম উচ্চতায় ছিল, তখন নভোচারীরা তাদের ক্যাপসুলটির পেছনের অংশ সামনের দিকে ঘুরিয়ে নেন; যাতে মডিউলের তলদেশে থাকা তাপ বর্মটি বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে আসা প্রথম অংশ হতে পারে।
আর ঠিক এখান থেকেই দুশ্চিন্তার শুরু।
আর্টেমিস-২ এর তাপ বর্ম কী দিয়ে তৈরি
অ্যাপোলো মহাকাশযানের মতো ওরিয়নের হিট শিল্ড বা তাপ বর্মও প্রধানত অ্যাভকোট নামের একটি উপাদানে তৈরি। এটি মূলত ইপোক্সি রেজিন এবং সিলিকা ফাইবারের এক বিশেষ সংমিশ্রণ।
বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় সৃষ্ট আগুন শোষণ করা এবং ধীরে ধীরে পুড়ে ক্ষয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এটি ক্যাপসুল ও নভোচারীদের রক্ষা করে। এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ, কারণ এই হিট শিল্ডকে ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়, যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক।
উল্লেখ্য, পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে ফিরে আসা মহাকাশযানগুলো যে ৩ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপ সহ্য করে, এটি তার চেয়েও অনেক বেশি।
তবে অ্যাপোলোর হিট শিল্ডের সঙ্গে তুলনা করলে ওরিয়নের ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়নে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অ্যাপোলো মহাকাশযানের তলদেশের ব্যাস ছিল ১২ ফুট ১০ ইঞ্চি। ওরিয়ন তার চেয়ে বড়। এর ব্যাস ১৬ দশমিক ৫ ফুট।
অ্যাপোলো তৈরির সময় এর তলদেশ মৌচাকের মতো ছাঁচে ৩ লাখ ৬০ হাজারটি পৃথক কোষে বিভক্ত ছিল, যার প্রতিটি অ্যাভকোট দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে আকারে বড় ওরিয়ন ক্যাপসুলটি ঢেকে দেওয়া হয় ২০০টি অ্যাভকোট টাইল দিয়ে। কিন্তু দেখা গেল, এই পদ্ধতিটি খুব একটা কাজে দেয়নি।
২০২২ সালের নভেম্বরে ওরিয়ন ক্যাপসুল এবং বিশাল স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে আর্টেমিস-১ মিশনটি কোনো নভোচারী ছাড়াই চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি দেয়।
মিশনটি নিখুঁতভাবেই চলছিল; যতক্ষণ না একটি বড় ত্রুটি ধরা পড়ে। যখন সাগরের পানি থেকে ক্রু ক্যাপসুলটি উদ্ধার করা হয়, তখন কারিগরেরা আতঙ্কিত হয়ে দেখেন, হিট শিল্ডে ১০০টিরও বেশি ফাটল এবং বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
বেশ কিছু জায়গায় অ্যাভকোট কাজ করতে ব্যর্থ হয়ে খসে পড়েছিল। এসব ফাটলের যেকোনো একটি দিয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের প্রচণ্ড তাপ মহাকাশযানের অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় বা সংকর ধাতুর দেয়াল পুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে যেতে পারত।
এতে ভেতর থাকা যেকোনো নভোচারীর মৃত্যু হতে পারত; ঠিক যেভাবে ২০০৩ সালে কলাম্বিয়া শাটলটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে সাতজন নভোচারীর মৃত্যু ঘটেছিল।
আর্টেমিস-১ এর হিট শিল্ডের সেই ত্রুটিগুলো থেকে যে বড় কোনো অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা ঘটেনি, তাকে নিছক ভাগ্যই বলতে হবে।
আর্টেমিস-২ এর ক্ষেত্রে এই সমস্যা সমাধানের জন্য নাসার সামনে দুটি পথ ছিল। হয় সম্পূর্ণ নতুনভাবে হিট শিল্ড তৈরি করা, যাতে মিশনটি অন্তত দুই বছর বা তার বেশি পিছিয়ে যেত অথবা বর্তমান শিল্ডটিকেই কিছুটা পরিবর্তন করা এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পথ বদলে তাপের মাত্রা কমিয়ে আনা।
নাসা দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয়। ২০২৪ সালে নাসার মহাপরিদর্শকের দপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় অ্যাভকোটের নিচে উত্তপ্ত গ্যাস জমে যাওয়ার কারণে হিট শিল্ডটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তাই আর্টেমিস-২ এর জন্য সংস্থাটি অ্যাভকোটের একটি ভিন্ন ও ছিদ্রযুক্ত মিশ্রণ ব্যবহার করে, যা সেই গ্যাসগুলোকে অনায়াসেই বেরিয়ে যেতে দেবে।
আর্টেমিস-২ এর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের গতিপথ কেমন ছিল
হিট শিল্ডের পাশাপাশি নাসা আর্টেমিস-২ এর পৃথিবীতে ফিরে আসার পথটিকেও কিছুটা সহজ করে দিয়েছিল।
আর্টেমিস-১ মূলত অ্যাপোলো মিশনগুলোর দেখানো স্কিপ-এন্ট্রি নামের একটি পথ অনুসরণ করেছিল। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা ধীরগতির মহাকাশযানগুলো যেভাবে সরাসরি বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে, অ্যাপোলোর যানগুলো তা করত না।
সেগুলো অনেকটা রোলার কোস্টারের মতো একবার বায়ুমণ্ডলে ঢুকত, তারপর আবার ওপরের দিকে বেরিয়ে যেত এবং পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করত। এই প্রক্রিয়ায় মহাকাশযানটি ধাপে ধাপে তাপ এবং মাধ্যাকর্ষণ বল কমিয়ে আনত।
কিন্তু আর্টেমিস-১ এর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি সহ্যসীমার বাইরে চলে গিয়েছিল। তাই আর্টেমিস-২ এর জন্য নাসা একটি মধ্যপন্থা বেছে নেয়। তারা পৃথিবীর কক্ষপথের মহাকাশযানের মতো একদম সোজা পথও নেয়নি, আবার আর্টেমিস-১ এর তুলনায় কিছুটা কম খাড়া পথ অনুসরণ করেছে।
বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের এই চরম মুহূর্তের আগে নাসার নীতিনির্ধারকেরা জানতেন, তারা আক্ষরিক অর্থেই আগুন নিয়ে খেলছেন। তবে নিজেদের পরিকল্পনার ওপর তাদের সতর্ক আশাবাদ ছিল।
গত ৯ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে আর্টেমিস-২ এর প্রধান ফ্লাইট ডিরেক্টর জেফ র্যাডিগান বলেন, ‘ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হতে হবে, এমন অন্তত ১৩টি বিষয় আমাদের তালিকায় আছে। আমার মাথায় একটি পুরো চেকলিস্ট ঘুরছে।’
নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় বলেন, ‘এটা বলা অসম্ভব, আপনার মনে কোনো অহেতুক ভয় কাজ করছে না। তবে আমি বলব, যা ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমার কোনো যৌক্তিক ভয় নেই। আমাদের যা কাজ করার ছিল, আমরা তা করেছি। রিকভারি টিম, ফ্লাইট কন্ট্রোল টিম এবং আমাদের কাজের বিশ্লেষণের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।’
সেই আস্থার প্রতিফলন শুক্রবার রাতে দেখা গেল, যখন পৃথিবীর বুক থেকে উড়ে যাওয়া নভোচারীরা সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় ফিরে এলেন।
২০২৩ সালে এই মিশনের জন্য নভোচারীদের নাম ঘোষণার পরপরই টাইম ম্যাগাজিন পাইলট ভিক্টর গ্লোভারের কাছে জানতে চেয়েছিল, অর্ধশতাব্দী পর আবারও চাঁদে যাওয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতখানি।
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আগে আমরা সফলভাবে সাগরে অবতরণ করি, তারপর নাহয় এই প্রশ্ন নিয়ে আবারও কথা বলা যাবে।’
শুক্রবার সেই অবতরণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সেই ইতিহাস এখন লেখা যেতেই পারে।