আইফোন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন টিম কুক। এর মাধ্যমে তার ১৫ বছরের বর্ণাঢ্য রাজত্বের অবসান হতে যাচ্ছে। কুকের নেতৃত্বে আইফোননির্ভর সমৃদ্ধির এই যুগে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ৩.৬ ট্রিলিয়ন ।ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬৫ বছর বয়সী কুক আগামী ১ সেপ্টেম্বর সিইওর দায়িত্ব অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রধান জন টার্নাসের হাতে তুলে দেবেন। তবে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার কিউপারটিনোভিত্তিক কোম্পানিটির সঙ্গে এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান (কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান) হিসেবে যুক্ত থাকবেন। এটি অনেকটা অ্যামাজনের জেফ বেজোস ও নেটফ্লিক্সের রিড হেস্টিংসের সিইও পদ ছাড়ার প্রক্রিয়ার মতোই, যারা অত্যন্ত সফল ক্যারিয়ার শেষে একই ধরনের পদে আসীন হয়েছিলেন।
এদিকে কুককে তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ করে দিতে অ্যাপলের নন-এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন আর্থার লেভিনসন। তবে তিনি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে থাকবেন।
এক বিবৃতিতে কুক বলেন, ‘অ্যাপলের সিইও হওয়া এবং এমন অসাধারণ কোম্পানিকে নেতৃত্ব দিতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয়। আমি আমার অস্তিত্ব দিয়ে অ্যাপলকে ভালোবাসি। এমন এক মেধাবী, উদ্ভাবনী, সৃজনশীল ও যত্নশীল দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’
৫০ বছর বয়সী টার্নাস ২৫ বছর ধরে অ্যাপলের সঙ্গে আছেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাকের প্রকৌশল বিভাগের তদারকি করছেন। এই অভিজ্ঞতাই তাকে টিম কুকের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘অ্যাপলের লক্ষ্যকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার এই সুযোগ পেয়ে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’
৩০ এপ্রিল অ্যাপলের চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের আর্থিক ফলাফল প্রকাশের দিন কুক ও টার্নাস এই নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন।
এদিকে অ্যাপলের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নতুন সিইওর হাতে দায়িত্ব যাচ্ছে। ২০০৭ সালে স্টিভ জবস প্রথম আইফোন আনার পর বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি শিল্পে সবচেয়ে বড় আলোড়ন তৈরি করেছে। অ্যাপল এআই প্রযুক্তিতে কিছুটা ধীরগতিতে শুরু করেছে এবং প্রায় দুই বছর আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এআইনির্ভর নতুন ফিচার যুক্ত করার ক্ষেত্রে হোঁচট খেয়েছে। এই বছরের শুরুর দিকে অ্যাপল শেষ পর্যন্ত এআই দৌড়ে এগিয়ে থাকা গুগলের সাহায্য নেয়, যাতে আইফোনের ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’কে আরও উন্নত ও বহুমুখী করে তোলা যায়।
ওয়েডবুশ সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক ড্যান আইভস বলেন, কুক অ্যাপলে এক বিশাল উত্তরাধিকার তৈরি করেছেন, তবে এআই কৌশল এখন মূল ফোকাস হওয়ায় টার্নাসের হাতে মশাল তুলে দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময় ছিল।
অনেকের ধারণা ছিল, কুকের মধ্যে স্টিভ জবসের মতো দূরদর্শী চিন্তার অভাব রয়েছে। কিন্তু কুক আইফোনের জনপ্রিয়তা ও তার পূর্বসূরির রেখে যাওয়া উদ্ভাবনগুলোকে কাজে লাগিয়ে অ্যাপলকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা কোম্পানিটির জন্য অকল্পনীয় ছিল। কুক দায়িত্ব নেওয়ার কিছুকাল পরেই অ্যাপল বিশ্বের প্রথম এক ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের পাবলিক কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে প্রথম দুই ট্রিলিয়ন ও তিন ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলকও স্পর্শ করে তারা।
তবে এআই প্রযুক্তিতে অ্যাপলের মন্থর গতির সুযোগে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া বাজিমাত করে। এআই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় প্রসেসরের আকাশচুম্বী চাহিদার ওপর ভর করে এনভিডিয়া প্রথম কোম্পানি হিসেবে চার ট্রিলিয়ন ও পরে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। অ্যাপল বর্তমানেচার৪ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের কোম্পানি। ২০১১ সালের আগস্টে যখন টিম কুক দায়িত্ব নেন, তখন এর মূল্য ছিল মাত্র ৩৫০ বিলিয়ন ডলার।
ফরেস্টার রিসার্চের বিশ্লেষক দীপঞ্জন চ্যাটার্জি বলেন, স্টিভ জবসের উত্তরসূরি হওয়া সহজ কাজ ছিল না, তবুও টিম কুক জবসের রেখে যাওয়া ভিত্তিকে একটি টেকসই ও শক্তিশালী আর্থিক শক্তিকেন্দ্রে রূপান্তর করেছেন।
আর্থিক সাফল্যের পাশাপাশি কুক ২০১৪ সালের অক্টোবরে নিজের সমকামিতার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করে আলোচিত হন। কোনো বিশ্বখ্যাত কোম্পানির শীর্ষ নেতার এমন স্বীকারোক্তিকে সমকামীদের অধিকার আন্দোলনে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
মৃত্যুর আগে স্টিভ জবস নিজেই কুককে উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৯৮ সালে সাপ্লাই চেইন তদারকির জন্য কুককে নিয়োগ দিয়েছিলেন জবস। উত্তরসূরিকে সবসময় নিজের ছায়ার সঙ্গে তুলনা করা হবে জেনে জবস কুককে উপদেশ দিয়েছিলেন—সবসময় নিজের সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী চলতে এবং কখনোই ভাববেন না যে স্টিভ হলে কী করতেন?
আলাবামার বাসিন্দা কুক এর আগে কমপ্যাক কম্পিউটার ও অ্যাপলের তৎকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী আইবিএমে কাজ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাকে দক্ষ করে তোলেন এবং চীনের সস্তা শ্রম ও কারখানার কার্যকারিতাকে কাজে লাগান। কুক যখন সিইও হন, তখন অ্যাপলের বার্ষিক আয় ছিল ১০৮ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৬ বিলিয়ন ডলারে।
তবে সমালোচকদের মতে, অ্যাপলের সেরা পণ্যগুলোর বেশির ভাগই জবসের আমলে পরিকল্পনা করা। চ্যাটার্জি বলেন, কুক অ্যাপলের প্রবৃদ্ধির ধারা সচল রাখলেও আইফোনের মতো এমন কোনো যুগান্তকারী উদ্ভাবন আনেননি, যা আগামী দুই দশকের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বদলে দেবে।
কোম্পানিটি অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপড ও ভিশন প্রো হেডসেট আনলেও সেগুলো জবসের উদ্ভাবনগুলোর মতো বিশ্ব কাঁপানো ছিল না। অন্যদিকে অ্যাপলের নিজস্ব চালকবিহীন গাড়ি তৈরির প্রকল্পটিও আলোর মুখ দেখেনি।
বিদেশের ওপর উৎপাদন নির্ভরতার কারণে কুককে রাজনৈতিক কূটনীতিতেও দক্ষ হতে হয়েছে, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আইফোনসহ অন্যান্য পণ্যকে শুল্কমুক্ত রাখতে রাজি করালেও বর্তমানে তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। আইফোন উৎপাদন চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার চাপে পড়ে কুক বর্তমানে ভারতেও উৎপাদন বৃদ্ধি করেছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি আইফোনের ওপর শুল্কের বোঝা কমানোর চেষ্টা করছেন।