ফোন নম্বর গোপন রেখেই হোয়াটসঅ্যাপে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে যাচ্ছে মেটার মালিকানাধীন বার্তা আদান-প্রদানের প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ। নতুন এই সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে একটি স্বতন্ত্র ইউজারনেম ব্যবহার করে চ্যাট করতে পারবেন। আর তাই সবার জন্য ফিচারটি চালুর আগেই পছন্দের ইউজারনেম সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন হোয়াটসঅ্যাপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কুণাল শাহ।
এতদিন হোয়াটসঅ্যাপে নতুন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে নিজের ফোন নম্বর শেয়ার করা ছাড়া বিকল্প ছিল না। কারও সঙ্গে কথোপকথন শুরু করতে হলে তার নম্বর সংরক্ষণ করতে হতো, একইভাবে নিজের নম্বরও অন্যের কাছে প্রকাশ পেত। ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে অনেক ব্যবহারকারীর উদ্বেগ ছিল।
সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই ইউজারনেম ব্যবস্থা চালু করছে হোয়াটসঅ্যাপ। এই সুবিধা চালু হলে ব্যবহারকারীরা মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট নাম ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারবেন। হোয়াটসঅ্যাপের দাবি, এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচলিত হ্যান্ডেলের মতো নয়; বরং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার একটি উদ্যোগ।
চলতি বছরের শেষ দিকে ফিচারটি সবার জন্য চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর আগেই গত ২৯ জুন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধাপে ধাপে ইউজারনেম সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া শুরু হয়েছে। কোনো এলাকায় এই সুবিধা চালু হলে ব্যবহারকারীরা অ্যাপের ভেতরেই একটি বিজ্ঞপ্তি পাবেন।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কুণাল শাহ জানান, তিনি নিজেই আগেভাগে নিজের ইউজারনেম সংরক্ষণ করে ফেলেছেন। তার ভাষায়, সঠিক সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবার জন্য সুবিধাটি চালু হওয়ার আগেই তিনি নিজের পছন্দের নাম নিশ্চিত করেছেন এবং অন্য ব্যবহারকারীদেরও দেরি না করে একই কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ একটি নাম একবার অন্য কেউ নিয়ে নিলে পরে সেটি আর পাওয়া যাবে না।
হোয়াটসঅ্যাপ বলছে, ইউজারনেম চালুর মূল উদ্দেশ্য ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আরও জোরদার করা। বাস্তবে এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে মানুষ ফোন নম্বর প্রকাশ না করেই যোগাযোগ রাখতে চান। নতুন কোনো সহকর্মী, কোনো নেটওয়ার্কিং অনুষ্ঠানে পরিচিত হওয়া ব্যক্তি, প্রতিবেশী কিংবা সন্তানের স্কুল বা খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় অনেকেই ব্যক্তিগত নম্বর দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। নতুন এই ফিচার সেই সমস্যার সমাধান দেবে।
তবে ইউজারনেম ব্যবহার করলেও এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো উন্মুক্ত অনুসন্ধানব্যবস্থা হবে না। ইনস্টাগ্রাম বা এক্সের মতো এখানে কোনো পাবলিক ডিরেক্টরি থাকবে না, যেখানে ইউজারনেম লিখে যে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ নিজেও অন্যদের কাছে কোনো ইউজারনেম সুপারিশ করবে না। কাউকে প্রথমবার বার্তা পাঠাতে হলে তার সঠিক ইউজারনেম জানা বাধ্যতামূলক হবে।
গোপনীয়তা আরও বাড়াতে ইউজারনেম ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘ইউজারনেম কি’ নামে একটি ঐচ্ছিক নিরাপত্তা সুবিধা। ব্যবহারকারী চাইলে একটি অতিরিক্ত কোড নির্ধারণ করতে পারবেন। নতুন কেউ ইউজারনেম ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে চাইলে তাকে সেই কোডও দিতে হবে। ব্যবহারকারী যেকোনো সময় এই কোড পরিবর্তন করতে পারবেন। ফলে কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণও থাকবে তার হাতেই।
ইউজারনেম সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমেই হোয়াটসঅ্যাপের সর্বশেষ সংস্করণে অ্যাপটি হালনাগাদ করতে হবে। এরপর ‘সেটিংস’ থেকে ‘অ্যাকাউন্ট’ অপশনে গেলে ইউজারনেম বেছে নেওয়ার সুবিধা দেখা যাবে। সেখানে পছন্দের কোনো উপলব্ধ ইউজারনেম নির্বাচন করে নিশ্চিত করলেই সেটি সংরক্ষিত হবে।
কনটেন্ট নির্মাতা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থা চাইলে তাদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মিল রেখে একই ইউজারনেমও ব্যবহার করতে পারবে। এতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই পরিচয় বজায় রাখা সহজ হবে।
হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, একটি ইউজারনেম সর্বোচ্চ ৩৫ অক্ষরের হতে পারবে এবং নির্ধারিত নামকরণের নিয়ম মেনে তৈরি করতে হবে। ব্যবহারকারীরা চাইলে ভবিষ্যতে যেকোনো সময় তাদের ইউজারনেম পরিবর্তন, হালনাগাদ বা মুছেও ফেলতে পারবেন।
ছদ্মবেশ ধারণ বা পরিচয় জালিয়াতি ঠেকাতে বিখ্যাত ব্যক্তি ও তারকাদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ইউজারনেম সংরক্ষিত রাখা হবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে অন্য কেউ সেসব নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারবে না।
নতুন এই ফিচার চালু হলেও বর্তমান ব্যবহারকারীদের জন্য বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না, যাদের ফোন নম্বর আগে থেকেই সংরক্ষিত রয়েছে, তাদের সঙ্গে আগের মতোই বার্তা আদান-প্রদান করা যাবে। ব্লক, রিপোর্ট ও এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের মতো বিদ্যমান নিরাপত্তা সুবিধাগুলোও অপরিবর্তিত থাকবে।
হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে ইউজারনেম সুবিধা সবার জন্য চালু করা হবে। তাই শুরুতেই সব ব্যবহারকারী এটি দেখতে পাবেন না। কোনো অঞ্চলে ফিচারটি চালু হলে অ্যাপের ভেতরেই সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের কাছে নোটিফিকেশন পাঠানো হবে। আর চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউজারনেম সুবিধার পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ সবার জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা