অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতা কিছুতেই যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি)। একের পর এক বিটিআরসির বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়মের খবর হরহামেশাই বেড়িয়ে আসছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি, অনিয়ম নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনও বহাল। এ কারণেই বিগত সরকারের আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ওই একই ছকে চলছে বিটিআরসি। এসব ঘটনার কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে দেওয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক বদলি।
সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিটিআরসির অফিস সরেজমিনে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনই সব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার এক অফিস আদেশে বিটিআরসির পরিচালক আফতাব মো: রাশেদুল ওয়াদুদ, মো: ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া, উপ-পরিচালক বেগম শারমিন সুলতানা, সনজিব কুমার সিংহ এবং এসএম আফজালকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহ এবং এসএম আফজালকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি এবং পদক্রমের নিম্ন পর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসির একাধিক সূত্র। বদলির আদেশটি জারি হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য। সূত্র বলছে, এর আগেও উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে গত এক বছরে হয়রানির উদ্দেশ্যে একাধিকবার বিভিন্ন বিভাগ ও শাখায় বদলি করা হয়েছে।
উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে এর আগে গত বছরের ২০ জানুয়ারি লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগ থেকে অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগে বদলি করা হয়। এর মাত্র ৪ মাস পর ২১ মে তাকে অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগে বদলি করা হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের কমিশনার ইকবাল আহমেদের মৌখিক নির্দেশে ওই কর্মকর্তাকে কোনো কাজ না দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রেখে ৩ মাস ১০ দিন পর পুনরায় ওই বছরের ৩১ আগস্ট বদলি করে এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট-এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার ঠিক ৭ মাস পর চলতি বছরের ৩১ মার্চ ওই কর্মকর্তাকে বিধিবহির্ভূতভাবে রংপুর মনিটরিং স্টেশনে নিম্নস্তরের পোস্টে বদলি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিটিআরসির দুই উপ-পরিচালককে ঢাকার বাইরে বদলি করার ঘটনায় টেলিযোগাযোগ খাতে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়েরের পরপরই এই বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অনেকের কাছে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। আদালতে রিট আবেদন দায়ের করেন বিটিআরসির ছয়জন উপপরিচালক। তারা হলেন—উপপরিচালক সনজিব কুমার সিংহ, কাজী মো. আহসানুল হাবীব মিথুন, জাকির হোসেন খান, এস এম আফজাল রেজা, মো. আসিফ ওয়াহিদ ও মো. হাসিবুল কবির।
৩১ মার্চ, মঙ্গলবার বিটিআরসির মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট থেকে রংপুর স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশনে এবং উপ-পরিচালক এস. এম. আফজাল রেজাকে স্পেকট্রাম বিভাগ থেকে সিলেট মনিটরিং স্টেশনে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনতিবিলম্বে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হবেন। অন্যথায় আগামী ২ এপ্রিল অপরাহ্নে তাদের ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিটিআরসির অতীতের কিছু বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে এই দুই কর্মকর্তা সম্প্রতি উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিট দায়েরের অল্প সময়ের মধ্যেই বদলির আদেশ জারি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই এটিকে প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ বলছেন, রিট পিটিশনকারী সকল কর্মকর্তাকেই শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হতে পারে। তবে এসব নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ তারা।
সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০০৯-১০ সালে বিটিআরসিতে ২৯ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ প্রদান করা হয়, যাদের চাকরিতে নিয়োগ পেতে কোনো লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়নি। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই তাদের সরকারি চাকরিতে পদায়ন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে বিধিবহির্ভূত। এই অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করেই উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন মামলা করা হয়। তারই ফলশ্রুতিতে ওই দুই উপ-পরিচালককে শাস্তিমূলকভাবে ঢাকার বাইরে পদায়ন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শাস্তিমূলক বদলির পাশাপাশি তাদেরকে দেওয়া হয়েছে পদক্রমের নিম্ন পর্যায়ের দায়িত্ব। অথচ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আদেশ উপেক্ষা করে কমিশন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উপরন্তু তাদের সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে বিদেশ ভ্রমণের আদেশ জারি করছে। বিটিআরসি কর্তৃপক্ষের এমন আদেশকে ঘিরে টেলিকম খাতে ব্যাপক ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রমতে, বিটিআরসিতে ১/১১-এর সময়ের এবং আওয়ামী লীগ আমলের কিছু বিতর্কিত নিয়োগ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে এই কর্মকর্তারা সম্প্রতি উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন মামলা দাখিল করেছিলেন। বিটিআরসির অভ্যন্তরীণ একটি পক্ষ এবং খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেই তড়িঘড়ি করে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করে ‘শাস্তি’ দেওয়া হলো। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যে কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে বা সংক্ষুব্ধ হলে তার প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করার অধিকার রয়েছে। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া একটি বৈধ আইনি প্রক্রিয়া। শুধু মামলা করার কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াকে ‘আদালত অবমাননা’ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। আদালতে যাওয়ার কারণে কোনো ধরনের প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হলে তা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে এবং ক্ষেত্রবিশেষে আদালত অবমাননার প্রশ্নও উঠতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার মতো একটি বৈধ প্রক্রিয়ার পর এমন দ্রুত বদলি প্রশাসনের ভেতরে একটি ভীতি বা অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এছাড়া উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে গত এক বছরে একাধিকবার বিভাগ পরিবর্তন করা হয়েছে, যা হয়রানিমূলক পদক্ষেপের অংশ হতে পারে।
সূত্রমতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিটিআরসির স্থাপিত স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশনগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রামে অবস্থিত এসব স্টেশন সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়, তবে দীর্ঘদিন ধরে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০০৮ সালের একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে ৩৬৯টি পদ সৃজনের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিটিআরসি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ সৃষ্টির ক্ষমতা একমাত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সেইক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে কীভাবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মতো ৩৬৯টি পদ সৃষ্টি করে এসব পদে জনবল নিয়োগ করে বিটিআরসি— এ ঘটনায় বিটিআরসির স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টিই প্রতীয়মান হয়।
যে অবৈধ ২৯ নিয়োগ নিয়ে রিট
এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন ‘জুনিয়র পরামর্শক’কে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। এসব নিয়োগকে সরকারের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এই ২৯ জন এখনো বহাল তবিয়তে বিটিআরসিতে কর্মরত। তাদের অন্যতম একজন উপ-পরিচালক খালেদ ফয়সাল রহমান। জুলাই হত্যা মামলার আসামি হয়েও বিটিআরসির দায়িত্ব পালন করছেন। খালেদ ফয়সাল রহমান দীর্ঘদিন বিটিআরসির প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একচ্ছত্র প্রভাব খাটিয়ে আসছিলেন। তিনি নিয়োগ কমিটির সচিব হিসেবে কর্মচারী, ড্রাইভার, এমএলএসএস থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন। সরকার-দলীয় লোক ছাড়া অন্য কেউ যেন চাকরির সুযোগ না পায়, বিশেষ করে বিরোধী দল বা জামায়াত সংশ্লিষ্ট কেউ যেন নিয়োগ না পান—তা নিশ্চিত করাই ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ‘জুলাই হত্যার আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে বিটিআরসি কর্মকর্তা’—শিরোনামে খালেদ ফয়সাল রহমানকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নাগরিক প্রতিদিন। প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ খানিকটা নড়েচড়ে বসলেও ফের একই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়মের ছকেই চলছে সংস্থাটি।
২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এসব বিষয়ে কথা বলতে বিটিআরসির মহাপরিচালক (প্রশাসন) মো. মেহেদী-উল-সহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ২টা ৩৪ মিনিট থেকে ৩৬ মিনিট পর্যন্ত ফোনে বারবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
একই দিনে বিটিআরসির চেয়ারম্যান (অব.) মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টায় অফিসে গেলে তিনি ব্যস্ততার কারণে দেখা করেননি। পরে তাকে দুপুর আড়াইটার দিকে দুই বার কল করা হলেও ফোনে পাওয়া যায়নি।
তবে দুপুর ২টা ৩৩ মিনিটের দিকে এসব বিষয়ে জানতে বিটিআরসির কমিশনার (ইএন্ডও) অব. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইকবাল আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি নাগরিক প্রতিদিনকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি সম্পৃক্ত নই। আমি এখানে কমিশনার (ইএন্ডও)।’
আরও কয়েকজনকে নাকি বদলি করা হতে পারে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় আপনারা সাংবাদিকরা কী করে জানেন? বদলিটা নিয়মিত কাজের একটি অংশ। এর সাথে রিটের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটি জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠান। এখানে সবার কাজ করার, সুরক্ষা পাবার অধিকার আছে। বদলিটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কমিশনার হিসেবে আমি যতটুকু জানি, আমাদের বিটিআরসির সেবাগুলো মাঠ পর্যায়ে দিতে চাই। এই কমিশন আসার পর ওয়ান স্টপ সার্ভিসটি চালু করেছে। এই সেবাটা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে একটু অভিজ্ঞদের দিলে ভালো হয় না?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে যদি কোনো অফিসার ক্ষুব্ধ হয়, যে কোনো কারণে, সে যদি কিছু না পেয়ে থাকে সেটারতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থাকে। কেউ চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতেই পারে। এই যারা ঢাকার বাইরে গেলেন, এরা সিনিয়র, তবে এত সিনিয়র নয়। এই অভিজ্ঞ অফিসাররা ওই অঞ্চলে গেলে, ওই এলাকার জনগণ তো ভালো সেবা পাবে। এভাবে আমি ভাবি বিষয়টি। আর একটা বিষয়, এরা সেখানে কতদিন থাকবে, জানি না। হয়তো কদিন পরেই চলে আসবে। কারণ সেখানে অনেক ভালো ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তাও না। এরকম অনেকেই যায়, আর ফিরে আসে।’