স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার দীর্ঘকালীন দৌরাত্ম্যের অবসান হয়েছে। বারবার বদলি ঠেকিয়ে দিলেও এবার আর শেষ রক্ষা হলো না তার। গত ২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার তাকে ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে এলজিইডি সদর দপ্তরে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে। ঢাকা জেলা অফিসের একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে অনেকে বলছেন, ক্লোজড কোনো শাস্তিই নয় তার জন্য। তিনি যেসব অপরাধ করেছেন, তাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকার কথা।
নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া অভিনব উপায়ে প্রকল্পে জালিয়াতি করা, ব্রিজে কেলেঙ্কারি, ভাইয়ের নামে ঠিকাদারি করা, সচিবের কণ্ঠ নকল করে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে ফোন দিয়ে পছন্দমতো জায়গায় পোস্টিং করিয়ে নেওয়ার মতো অপরাধও তিনি করেছেন ঠান্ডা মাথায়। অপরাধের কারণে বিভাগীয় শাস্তিও পেয়েছেন এনবিআরের দুর্নীতির তালিকাভুক্ত এই প্রকৌশলী। নাগরিক প্রতিদিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে এই প্রকৌশলী সম্পর্কে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
বদলি বাতিলের ‘ম্যাজিক’ ও অদৃশ্য ক্ষমতা
প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়ার ক্ষমতার দাপট এমন পর্যায়ে ছিল যে, সরকারি বদলির আদেশ জারির এক মাসের মাথায় তা বাতিল হয়ে যেত। সূত্র জানায়, বদলি ঠেকানো বাচ্চু মিয়ার ‘বাঁ হাতের খেল’। সূত্রের তথ্যমতে, গত ১১ জানুয়ারি তাকে ঢাকা জেলা থেকে সদর দপ্তরে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মাত্র এক মাস ছয় দিনের মাথায় ১৭ ফেব্রুয়ারি সেই আদেশ বাতিল করে তাকে পুনরায় ঢাকার দায়িত্বেই বহাল রাখা হয়। দীর্ঘ সময় একই দপ্তরে খুঁটি গেড়ে বসে থেকে তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
দুর্নীতির একচ্ছত্র ‘রাজা’
অভিযোগ রয়েছে, বাচ্চু মিয়া এলজিইডিতে দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, টেন্ডার জালিয়াতি, আত্মীয়কে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ শেষ না করেই বিল পেমেন্টসহ পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পে জালিয়াতি: ঢাকার মিরপুরে গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ শেষ না হতেই তিনি সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করেন।
নবাবগঞ্জের ব্রিজ কেলেঙ্কারি: নবাবগঞ্জের বান্দুরায় ইছামতী নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণে ৯টি স্প্যানের মধ্যে একটির কাজ বাকি থাকলেও ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি দেখিয়ে প্রায় ৫১ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অনৈতিক সাহস দেখিয়েছেন তিনি।
ভাইয়ের নামে ঠিকাদারি: নিজের ভাই শহিদুল ইসলাম সুমনের একটি ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে ‘মোহনা এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান এলজিইডিতে তালিকাভুক্ত করেন বাচ্চু মিয়া। মাহমুদ এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে অফিস রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেখিয়ে প্রায় ৪৮.৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে জমা আছে।
রাজনৈতিক ডিগবাজি ও দলবদলের খেলা
বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নিতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর প্রভাবশালী নেতা সেজে তিনি প্রভাব খাটাতেন। বিতর্কিত সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ একাধিক নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের অনুসারী হওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও নেপথ্যে তার দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট আগের মতোই সচল ছিল।
বিচিত্র জালিয়াতি: মুখ্য সচিবের কণ্ঠ নকল
বাচ্চু মিয়ার জালিয়াতির কায়কারবার থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়! ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের কণ্ঠ নকল করে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে ফোন দিয়ে নিজের পছন্দমতো জায়গায় (নেত্রকোণায়) পোস্টিংও করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। দেড় মাস পর জালিয়াতি ধরা পড়লে তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও এনবিআর-এর করা ৩০০ দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর তালিকাতেও তার নাম রয়েছে।
নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ
সরকারি আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বাচ্চু মিয়া ও তার পরিবার।
ফ্ল্যাট ও প্লট: উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে স্ত্রীর নামে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, গাজীপুরের নিশাদনগর ও জয়দেবপুরে বাড়ি এবং পূর্বাচলে প্লট রয়েছে তার।
বিলাসবহুল গাড়ি: ২০২২ সালে স্ত্রীর নামে কেনা একটি গাড়ির (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৫-২৯৫২) দলিলে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম দেখিয়ে সরকারি কর ফাঁকি দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বেনামি গাড়ি ও বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
মুখ খুলছেন না ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
বাচ্চু মিয়ার বদলির পর ঢাকা জেলা অফিসের গুমোট পরিবেশ কিছুটা কাটলেও আতঙ্কে মুখ খুলছেন না অনেক কর্মকর্তা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়াকে গত ৩ মার্চ, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে ৩৫ মিনিটের মধ্যে দুবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। পরে আবার ৭টা ৪ মিনিটে তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। বদলির পর ৮ এপ্রিল, বুধবার ৫টা ৪৩ মিনিটের দিকে তাকে পুনরায় ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তৃতীয় দফায় ৮ এপ্রিল, বুধবার রাত ৮টার দিকে প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়া এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনকে তাদের মোবাইলফোনে বক্তব্যের জন্য এসএমএস করা হয়। এসএমএস-এর পর তাদের আবারও ফোন করা হয়, কিন্তু তারা দুজন কোনো জবাব দেননি, ফোনও ধরেননি।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তাদের দাবি, শুধু বদলি নয়, বাচ্চু মিয়ার দুর্নীতির যদি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তবে এলজিইডির ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থ কেলেঙ্কারির মুখোশ উন্মোচিত হবে।
আরও পড়ুন:
অনিয়ম অনিঃশেষ ১: বিটিআরসিতে প্রতিবাদ করলেই শাস্তিমূলক বদলি!
অনিয়ম অনিঃশেষ ২: পেশায় জালিয়াতি, নেশায় মানবপাচার—কে এই আবু রায়হান?