আয়কর ফাইলে কারসাজি
জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে, তার প্রমাণ রাজধানীর কর অঞ্চল-৫, সার্কেল-৯৪। যেখানে সাধারণ মানুষের প্রতিটি অর্থের হিসাব রাখা হয়, সেখানেই রাষ্ট্রের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নথিপত্র জালিয়াতির ‘নীল নকশা’ উন্মোচন করেছে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। ব্যবসায়ী সদরুল হাসান ও তার স্ত্রী উর্মি হাসানের বিরুদ্ধে উঠেছে প্রায় ৬ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ২০ কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করার গুরুতর অভিযোগ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দম্পতির বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা প্রায় ২৬ কোটি টাকার এফডিআর বর্তমানে অবরুদ্ধ রয়েছে।
আয়কর গোয়েন্দাদের তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে এক অলৌকিক জালিয়াতির গল্প। ব্যবসায়ী সদরুল হাসানের ২০১৬ থেকে ২০২০ করবর্ষ পর্যন্ত জমা পড়া রিটার্নে খোদ করদাতার কোনো স্বাক্ষরই নেই! অন্যদিকে, তার স্ত্রী উর্মি হাসানের আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন ইস্যু হয়েছে ২০২২ সালের ২৬ জুলাই। কিন্তু নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে, তিনি ২০১৭ সালের রিটার্ন ২০১৭ সালেই জমা দিয়েছেন! অর্থাৎ, টিআইএন আইডি জন্মের ৫ বছর আগেই তিনি রিটার্ন দাখিলকারী হিসেবে খাতায় নাম লিখিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষায়, এটি ‘সুস্পষ্ট এবং অকাট্য জাল-জালিয়াতির প্রমাণ’।
কীভাবে সম্ভব হলো সময়ের কাঁটা পেছনে ঘুরিয়ে দেওয়ার এই ডিজিটাল জালিয়াতি? তদন্তকারীদের জেরার মুখে থলের বিড়াল বের করে দিয়েছেন সার্কেলের সাবেক কর্মচারী ও বর্তমানে সার্কেল-৯৭-এ কর্মরত নোটিশ সার্ভার গাজী আমিনুল ইসলাম। তিনি লিখিতভাবে স্বীকার করেছেন, সদরুল ও উর্মি দম্পতির অবৈধ সম্পদকে আইনি রূপ দিতে আয়কর দপ্তরের মূল রিটার্ন রেজিস্টারের পুরোনো ফাঁকা জায়গাগুলোতে পরবর্তীতে অবৈধভাবে নাম ও তথ্য এন্ট্রি করা হয়েছিল। টাকার বিনিময়ে রাষ্ট্রের খাতা বিক্রির এই স্বীকারোক্তি আয়কর প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তদারকিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, এই জালিয়াতির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশাল অঙ্কের কালো টাকাকে বৈধতা দেওয়া। সদরুল হাসান জাল নথির মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকার সম্পদ দেখান। এদিকে উর্মি হাসান প্রদর্শন করেন প্রায় ৫ কোটি ২৩ লাখ ৪১ হাজার টাকার সম্পদ। আইনবহির্ভূতভাবে এই ২০ কোটি ৪৭ লাখ টাকার সম্পদ প্রদর্শন করে তারা রাষ্ট্রের প্রায় ৬ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের নির্দেশে এই দম্পতি ও তাদের পরিবারের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা মোট ২৬ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার ৫৭৮ টাকার এফডিআর স্থিতি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। করদাতা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ আনলেও, রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশের ওপর পুনরায় স্টে-অর্ডার জারি করে ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন।
এই মহাজালিয়াতির বিষয়ে জানতে নাগরিক প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে ব্যবসায়ী সদরুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ হন এবং কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। তার স্ত্রী উর্মি হাসানও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জানান, এ বিষয়ে তাদের কিছু বলার নেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। এখনই পদেক্ষপ গ্রহণ করা করলে ভবিষ্যতে আরও ঝুকির মুখে পড়বে।
একজন সাধারণ নোটিশ সার্ভারের পক্ষে একা পুরো রাজস্ব দপ্তরের রেজিস্টার ও সিস্টেম হ্যাক করা বা পরিবর্তন করা অসম্ভব। এই মাস্টারপ্ল্যানের পেছনে কোনো প্রভাবশালী আয়কর আইনজীবী বা কর কর্মকর্তা জড়িত? ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার করা জরুরি বলে অনেকে মনে করছেন।