অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্প (পর্ব- ১)
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের অধীনে বাস্তবায়নাধীন অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পের উপপরিচালক শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, প্রকল্পে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে আত্মীয়করণ, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রকল্পের বিভিন্ন কেনাকাটায় আর্থিক কেলেঙ্কারিসহ প্রকল্পে কর্মরত নারী কর্মকর্তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, শেখ মোহাম্মদ মোতালিব অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পে কর্মরত এক নারী কর্মকর্তাকে ক্রমাগত অনৈতিক প্রস্তাব, যৌন হয়রানি ও প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করে যাচ্ছেন। পরে ওই নারী কর্মকর্তার দায়ের করা লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে শেখ মোহাম্মদ মোতালিবকে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, গত ১৯ জুলাই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ সেলিম হোসেন সাক্ষরিত এক অফিস আদেশে মোতালিবকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি এই প্রকল্পের প্রশাসন ও অর্থ শাখার উপপরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়োগ বাণিজ্যসহ প্রকল্পের কেনাকাটায় অনিয়মসহ বিভিন্ন খাতে বাজেটের টাকা আত্মসাৎ করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র’ শীর্ষক প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের বিরুদ্ধে অনৈতিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে উপ-প্রকল্প পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)-এর নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হতে নির্দেশক্রমে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। অব্যাহতি আদেশ প্রাপ্তির পর আগামী ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখের মধ্যে কাগজপত্র/নথি/দলিলাদির তালিকা প্রণয়ন করে তা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-প্রকল্প পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাঃ আবু তাহিরের নিকট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন দাখিল করা এক অভিযোগে ওই নারী কর্মকর্তা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে শেখ মোহাম্মদ মোতালিব তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। তিনি সেই প্রস্তাবে সাড়া না দিলে বিভিন্নভাবে তার সঙ্গে শ্লীলতাহানিমূলক আচরণ করা হয়। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হয়রানি ও বদলি করা হয়। অভিযোগকারী আরও উল্লেখ করেন, শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন, ভয়ভীতি ও কর্মস্থলে অযৌক্তিক চাপের কারণে তিনি গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত গর্ভপাতের মতো মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হন।
আরও অভিযোগ ওঠে, এ ধরনের ঘটনা একটি-দুটি নয়। তিনি এই প্রকল্পে কর্তরত অনেক নারী কর্তকর্তা এবং কর্মচারীর সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করেছেন। তার অনৈতিক প্রস্তাবে যারা সাড়া দিয়েছেন তারা বহাল তবিয়তে প্রকল্পে কর্মরত রয়েছেন এবং যারা সাড়া দেননি, তাদেরকেই করা হয়েছে প্রসাশনিক নানা ধরনের হয়রানি, অবশেষে বদলি।
ওই নারী কর্মকর্তার অভিযোগের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। তদন্তে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা এড়াতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে, শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পের উপ-পরিচালক পদ থেকে অব্যহতির অফিস আদেশটি গত ২২ জুলাই নাগরিক প্রতিদিনের হাতে আসে। এছাড়াও ওই প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে তার বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য ও দলিলাদিও নাগরিক প্রতিদিন পর্যালোচনা করছে। চলমান রয়েছে অনুসন্ধানও।
দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও নিয়োগে আত্মীয়করণের অভিযোগ
প্রকল্পে কর্মরত নারী কর্মকর্তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগের পাশাপাশি প্রকল্পটির বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতি নিয়েও মোতালিবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তা শেখ মোতালিব তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্পে তার প্রায় ৩০ জন নিকটাত্মীয়কে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সরকারি প্রকল্পে এমন নিয়োগ বড় রকমের স্বার্থের সংঘাত এবং নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের শামিল বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সূত্র বলছে, এই ধরনের নিয়োগ দুর্নীতির পক্ষে বড় রকমের সহায়ক।
এছাড়াও শেখ মোহাম্মদ মোতালিবের বিরুদ্ধে প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পে জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ। নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া, কেন্দ্রভিত্তিক শিশুদের টিফিন বাবদ বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, শিশুদের অ্যাক্টিভিটিজ অব ডেইলি লিভিং প্রশিক্ষণের বরাদ্দ আত্মসাৎ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, এনডিডি ব্যক্তির পিতামাতার কর্মসংস্থানের জন্য বিশেষ অনুদানের বরাদ্দ আত্মসাৎ, কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি।
অভিযোগকারীদের মতে, এসব অনিয়মের কারণে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়েছে এবং অটিজম ও অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুদের সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এসব অনিয়মের কারণে প্রকল্পের প্রকৃত সেবাগ্রহীতা—অটিজম ও অন্যান্য নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুরা প্রত্যাশিত মানের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০২২ সালের ২ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ‘অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র’ স্থাপন করে অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। উচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২২ সালের এপ্রিল মাস থেকে বর্তামান সময় পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, অটিজম ও এনডিডি বৈশিষ্টসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি টিম দ্বারা প্রকল্প এলাকার প্রায় এক লাখ অটিজমসহ অন্যান্য এনডিডি শিশু ও ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিবন্ধিতার মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী বয়সভিত্তিক প্রয়োজনমাফিক ১৭ ধরনের সেবা প্রদান। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে—ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, সাইকোথেরাপি, গ্রুপথেরাপি, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলিং বা কাউন্সিলিং সেবা, সহায়ক উপকরণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা প্রদান, ঔষধ বিতরণ, সিবিআর (কমিউনিটি বেইজড রিহ্যাবিলিটেশন) অ্যাপ্রোচে সেবা প্রদান, অ্যাক্টিভিটিস অব ডেইলি লিভিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ, এনডিডি ব্যক্তির জন্য আয়বর্ধক কার্যক্রম বিষয়ক প্রশিক্ষণ, এনডিডি ব্যক্তির মা-বাবার কর্মসংস্থান, এনডিডি ব্যক্তির প্রতিভা অন্বেষণ ও লালনসহ পুরস্কার প্রদান, প্রতিবন্ধীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল গঠন করে দলীয় কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সেবা কেন্দ্রভিত্তিক প্রতিবন্ধী বা এনডিডি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কমিটি ও কমিটিভিত্তিক কার্যক্রম ইত্যাদি।
কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে গত চার বছরে এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে সেটিই এখন দেখার বিষয়। সূত্র বলছে, বিগত সরকারের সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এর যোগসাজশে এই প্রকল্পের হিংসভাগ অর্থই অত্মসাৎ করেছেন এই অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোতালিব ও তার সহযোগিতায় থাকা বিগত সরকারের সিন্ডিকেট। সরকারি অর্থায়নে প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নের এই প্রকল্পে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিগত সরকারের প্রতিমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এর সঙ্গে যোগসাজশে এবং অনৈতিক আর্থিক লেনদেন থাকার কারণে প্রকল্পের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও পাত্তাই দিতেন না এই মোতালিব। বিগত সরকারের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি এই প্রকল্পের অর্থ লুটপাটের রাম-রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ খুবই গুরুতর বিষয়। সরকার যখন কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে তখন কোনো সরকারি কর্মচারীর এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত উদ্বেগের। এটি সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেবে। একইসঙ্গে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগও গুরুতর। এই বিষয়ে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার কাজ চলছে। উপযুক্ত নিয়মেই তদন্ত কার্যক্রম চলবে এবং দোষ প্রমাণিত হলে নিয়মানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসব বিষয়ে জানতে গত ২২ জুলাই বুধবার সন্ধ্যার দিকে শেখ মোহাম্মদ মোতালিবকে ফোন করা হলে তিনটি ফোনটি রিসিভ করেননি। পরে রাত পৌনে ৮টার দিকে তিনি ফোন দেন এবং প্রতিবেদকের কাছে এসব অভিযোগ ভুয়া বলে দাবি করেন।
পরে নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানির কারণে আপনাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে—বিষয়টি সত্যি কিনা জানতে চাইলে তিনি চুপ থাকেন এবং ফোনটি কেটে দেন। পরে বেশ কয়েকদিন তাকে ফোন করেও আর পাওয়া যায়নি।