কমদামে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র পাচ্ছে কোথায়?
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৬টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। অস্ত্রগুলো কোথায়, কার হাতে এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও নেই। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন এবং তার আগের দিন দেশজুড়ে পুলিশের ৪৬০টি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৫ হাজার ৮২৯টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও এখনও ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ নিখোঁজ রয়েছে।
হাত বদল হয়ে অস্ত্র যাচ্ছে অপরাধীচক্রের হাতে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ড ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছে গেছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন সহিংস অপরাধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, কিছু সরকারি পিস্তল ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র হাতবদল হয়ে কালোবাজারে বিক্রি হয়েছে। তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় অপরাধী চক্র সহজেই এসব অস্ত্র সংগ্রহ করতে পেরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহদাত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যেগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি, সেগুলো উদ্ধারে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
তবে দুই বছর পরও এক-চতুর্থাংশের বেশি অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এদিকে ৫ আগস্টের হামলায় শুধু অস্ত্রই নয়, দেশের বিভিন্ন থানার গুরুত্বপূর্ণ নথি ও আলামতও ধ্বংস হয়ে যায়। রাজধানীর ছয়টি থানায় পুড়ে যায় ১ হাজার ২২৬টি মামলার নথি। মিরপুর মডেল থানায় ধ্বংস হয় ৬৬০টি মামলার ফাইল এবং মালখানায় থাকা ২৩০টি আলামত। যাত্রাবাড়ী থানায় পুড়ে যাওয়া নথি ও জব্দকৃত আলামতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব আজও সম্পন্ন হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব নথি ধ্বংস হওয়ায় বহু মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমও জটিল হয়ে পড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে শুধু সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানাতেই ৪ আগস্ট নিহত হন ১৫ জন।
পুলিশ সদস্য হত্যা, থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলার বিচার ও অস্ত্র উদ্ধারের অগ্রগতি নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় অস্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের হাতে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিটি উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের অপরাধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা সংঘবদ্ধ সহিংসতায় ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বহন করছে। শুধু নিয়মিত অভিযান নয়; গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক বিশেষ অভিযান, অস্ত্রের কালোবাজার চিহ্নিতকরণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
তবে দুই বছর পেরিয়ে গেছে। অনেক কিছু স্বাভাবিক হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোতে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত, রাষ্ট্রের থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩২৬টি অস্ত্র এখন কোথায়? কার হাতে রয়েছে সেগুলো? আর সেগুলো উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজছে রাষ্ট্র।