বয়স বড্ড কঠিন বিষয়। সময়ের সঙ্গে বয়স বাড়ে, গতি কমে যায়। আর বেশিরভাগ ফুটবলারের ক্ষেত্রে সেই মঞ্চটা ছেড়ে দিতে হয় নীরবে। তখন তারা ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যারা শুধু খেলোয়াড় নন, তারা নিজেরাই সময়কে সংজ্ঞা দেন নতুন করে। যেন সময়কেই বুড়ো আঙ্গুল দেখান। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে এমনই কয়েকজন মহাতারকা আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, বয়স কেবলই একটি সংখ্যা।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেই প্রমাণের পরিচিত এক নাম। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪১ এ পা রাখবেন তিনি। এই বয়সেও পর্তুগাল আর আল নাসরকে একই সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিআর সেভেন। ২০২৫ সালে পর্তুগালের উয়েফা নেশনস লিগ জয়ে রোনালদোই ছিলেন প্রতিযোগিতা সর্বোচ্চ গোল স্কোরার। ফাইনালে র্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল স্পেনকে হারিয়ে এই শিরোপা জেতে রবার্তো মার্তিনেজের দল। সেই ফাইনাল ম্যাচেও গোল করেছিলেন রোনালদো।
এছাড়াও সৌদি প্রো লিগে সর্বোচ্চ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। সব রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে সর্বোচ্চ গোলেও সবার ওপরের নামটা রোনালদোরই। এমনকি চলতি বছরেও ফোর্বসের সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলার হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন ফুটবলের এই মহাতারকা। সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপ—এটাই শেষ, হয়ত ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি।
লিওনেল মেসি
লিওনেল মেসির গল্পটা যেন মহাকাব্যের মতো। ৩৮ বছর বয়সে এসে আমেরিকার মাটিতে ইন্টার মায়ামিকে কেবল আলোচনায় আনেননি তিনি, এনে দিয়েছেন শিরোপাও। গোল করেছেন, গোল করিয়েছেন, আর সবচেয়ে বড় কথা—একটি ক্লাবকে জেতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মাঠে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি এখনো বাকিদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। ফলে সর্বোচ্চ গোল করে এমএলএসের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন এই খুদে জাদুকর।
সামনে মেসির শেষ বিশ্বকাপ—সেই মিশনে শিরোপা ধরে রাখতে মেসি খেলবেন পুরোটা উজাড় করে। হয়ত হতে পারে নতুন কোনো ইতিহাস, অবশ্য আগেই তো ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটা লিখেছেন স্বর্ণাক্ষরে।
লুকা মদ্রিচ
এই মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে এসি মিলানে যোগ দিয়েছেন ম্যাজিকাল লুকা মদ্রিচ। মাদ্রিদ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৮টি ট্রফি জিতে রেকর্ডের পাতায় নাম লেখান তিনি। এছাড়াও খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার রেকর্ডটাও মড্রিচেরই। মাঝমাঠে বয়সকে নীরবে হার মানাচ্ছেন ক্রোয়েশিয়ান এই মিডফিল্ডার।
৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ম্যাচের গতি, ছন্দ আর নান্দনিকতা-শৈল্পিকতা এখনো তার পায়ের তালুতে শোভা পায়। কাঁধে আর্মব্যান্ড পড়ে ক্রোয়েশিয়াকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। এবারই ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে হয়ত হতে পারে নতুন রোমাঞ্চকর কোনো অধ্যায়।
থিয়াগো সিলভা
ফুটবলে আরেক কিংবদন্তি থিয়াগো সিলভা। ফ্লুমিনেন্সের হয়ে ২০২৫ সালে ৪১ বছর বয়সি সিলভা খেলেছেন মোট ৪৬টি ম্যাচ। এই বয়সে পর্তুগালের জায়ান্ট ক্লাব পোর্তোতে ফিরেছেন তিনি। পর্তুগীজ এই জার্সিতে নতুন অধ্যায় শুরু করা এই ব্রাজিলিয়ান তার ক্যারিয়ারে জিতেছেন মোট ৩২টি ট্রফি। তবু ক্ষুধা এখানেই শেষ হয়নি।
সিলভার কাছে বয়স মানে কেবলই এক সংখ্যা, অভিজ্ঞতা, আর ম্যাচ জেতার কৌশল। সামনে বিশ্বকাপের স্বপ্ন চোখে কার্লোর দলে ডাক পাবেন কী না তা সময়ই বলে দেবে। তবে থিয়াগো সিলভা যে মাথা নুইয়ে দেওয়া মানুষ নন, তা সবারই জানা।
ম্যানুয়েল নয়ার
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সময়কে যেন আটকেই রেখেছেন ম্যানুয়েল নয়ার। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি শুধু গোল বাঁচান না, খেলাও গড়ে দেন।
আধুনিক গোলকিপিংয়ের ধারণাটাই তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। অবশ্য জার্মান দল থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই বয়সেও গত মৌসুমে জিতেছেন বুন্দেসলিগার শিরোপা। আর চলতি মৌসুমের ১২ ম্যাচে রেখেছেন ৫টি ক্লীনশীট।
এই সব নাম মিলিয়ে ২০২৫ সাল যেন এক প্রতিরোধের বছর। এরা সবাই প্রমাণ করছেন—ফুটবল কখনও কখনও বয়স দেখে না। ফুটবল দেখে ক্ষুধা, সাহস আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। সামনে বিশ্বকাপ, সামনে আরও একটি সুযোগ—সময়ের বিরুদ্ধে জিততে হবে আরেকবার।