আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন। তিনি একজন বাংলাদেশি আন্দোলনকর্মী, ছাত্রনেতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আসিফ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম একজন সমন্বয়ক, যিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সভাপতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–১০ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তিনি। ভোটে প্রার্থী হওয়ার মধ্যদিয়ে তিনি আবারও আলোচনার জন্ম দেন। ভোটে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণের পর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগের দিন গত ১১ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।
২৬ ডিসেম্বর, শুক্রবার নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া পোস্টে তিনি দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘সংঘবদ্ধ রিপোর্ট’ করার মাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড অফিশিয়াল পেজটি রিমুভ করে দেওয়া হয়েছে। আসিফ মাহমুদ পোস্টে লেখেন, ‘ওসমান হাদি ভাই সংশ্লিষ্ট সব পোস্ট, ভিডিওতে স্ট্রাইক এবং সংঘবদ্ধ রিপোর্ট করে আমার অফিশিয়াল পেজটি রিমুভ করে দেওয়া হয়েছে।’ এই পেইজে ৩০ লাখের বেশি ফলোয়ার ছিল। এই ঘটনাটিও আজ বিভিন্ন গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে।
আসিফ ১৯৯৮ সালের ১৪ জুলাই কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার আকুবপুর ইউনিয়নের আকুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন ও মা রোকসানা বেগম। আসিফের প্রাথমিক শিক্ষা মা-বাবার হাতে। প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পায়ের খোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাধ্যমিক শিক্ষা পায়ের খোলা উচ্চ বিদ্যালয় ও আকুবপুর ইয়াকুব আলী ভুঁইয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে। আসিফ মাহমুদ ঢাকার তেজগাঁওয়ের হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। পরে ২০১৭ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ওই কলেজের বিএনসিসি ক্লাবের প্লাটুন সার্জেন্ট ছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে অধ্যয়ন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। এছাড়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়েও অপর একটি বিষয়ে মাস্টার্স করছেন আসিফ মাহমুদ।
আসিফের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে রাজনীতি শুরু করেন। তিনি ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রথম সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় নেতাদের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন আসিফ। পরে ২০২৩ সালে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামে একটি ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে, যার ঢাবি কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদ। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি এবং তার সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২৪’র গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী হত্যা ও বিনা বিচারে আন্দোলনকারীদের নির্যাতনের জন্য অতি মানবীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি এবং তার সংগঠনের আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও সারজিস আলম মিলে সারাদেশে একযোগে অসহযোগ আন্দোলন এবং পরিশেষে লংমার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির ডাক দেন। যার ফলশ্রুতিতে ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়।
আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ৯ আগস্ট যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট তিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
২০২৫ সালের জুন মাসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা তল্লাশির সময় আসিফ মাহমুদের হাতের লাগেজে একটি আগ্নেয়াস্ত্রের ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ফের আলোচনায় আসেন আসিফ মাহমুদ। তিনি মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিতব্য ‘ওআইসি ইয়ুথ ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। পরে আসিফ ফেসবুকে জানান, ভুলবশত ম্যাগাজিনটি তার ব্যাগে রয়ে গিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তিনি একাধিক হামলার শিকার হয়েছেন, এটি তার নিরাপত্তার স্বার্থে লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র। তিনি আরও জানান, সরকারি নিরাপত্তার ঘাটতি থাকায় আইনগতভাবে তিনি নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য অস্ত্র বহন করেন।