চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। যে নাম একসময় ফুটবল দুনিয়ায় গর্বের প্রতীক ছিল, এখন যেন এক দীর্ঘ হতাশার গল্প। টানা তিনটি বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হওয়া দলটির বর্তমান অবস্থায় ক্ষুব্ধ থেকে শুরু করে হতবাক, সব শ্রেণির সমর্থকই।
সবকিছু নির্ভর করছিল একটি ম্যাচে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে হারাতে পারলেই ১২ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরতে পারত ইতালি। কিন্তু ইউরোপিয়ান প্লে-অফ ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে সেই স্বপ্ন আবারও ভেঙে যায়। ২০১৪ সালের পর ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ আর দেখা যাচ্ছে না আজ্জুরিদের। এ বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
ক্ষোভ তাই মাঠ ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে রাস্তায়। রোমে ইতালি ফুটবল ফেডারেশন (এফআইজিসি)-এর ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছেন সমর্থকেরা, এমনকি ডিম ছুড়ে প্রতিবাদও জানিয়েছেন। ইতালির ফুটবল ইতিহাসে এমন বেহাল দশা আগে খুব কমই দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে সংস্কারের ডাক দিয়েছেন দেশটির ক্রীড়ামন্ত্রী আন্দ্রে আবদি। তার মতে, সমস্যার সমাধান শুরু করতে হবে একেবারে শীর্ষ স্তর থেকেই। তিনি বলেন, ‘ইতালির ফুটবলকে একেবারে গোড়া থেকে গড়তে হবে। ফেডারেশনের শীর্ষ পর্যায় থেকে সংস্কার শুরু হতে হবে।’
২০১৮ সালে কার্লো তাভেচ্চিও বিদায় নেওয়ার পর এফআইজিসির দায়িত্বে আছেন গ্যাব্রিয়েল গ্রাভিনা। টানা ব্যর্থতার পর তার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে জোরালোভাবে। যদিও এখনই সরে দাঁড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি বৈঠকে বসার পরিকল্পনা রয়েছে, আর আগামী সপ্তাহে বোর্ড সভায় তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ইতালির এই পতনটা একদিনে হয়নি। ২০১৭ সালে সুইডেনের কাছে প্লে-অফে হেরে ২০১৮ বিশ্বকাপ মিস করে তারা। এরপর উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে হেরে ২০২২ বিশ্বকাপ থেকেও ছিটকে যায়। আর এবার বসনিয়ার কাছে হেরে সেই ব্যর্থতার হ্যাটট্রিক পূর্ণ হলো। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১২ নম্বরে থাকা একটি দলের জন্য ৬৫ নম্বর দলের কাছে হার!
এই দুঃসময়ে দলের দায়িত্বে আছেন গাত্তুসো। যিনি খেলোয়াড় হিসেবে ২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ের অংশ ছিলেন। সেই গাত্তুসোই এখন দেখছেন নিজের দলকে বিশ্বকাপের বাইরে পড়ে থাকতে। ম্যাচ শেষে শিষ্যদের কান্না যেন ছুঁয়ে যায় তাকেও। তার কণ্ঠে ছিল হতাশা, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে। সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার নিজের কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে এই দলটাকে দেখে যারা এই কয়েক মাসে সত্যিই সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। এটা আরেকটা বড় ধাক্কা। যদিও এবার আমরা এর যোগ্য ছিলাম না।’
২০২৫ সালের জুনে লুসিয়ানো স্পালেত্তিকে বরখাস্ত করার পর কোচের দায়িত্ব পান গাত্তুসো। তার চুক্তি আছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। বিশ্বকাপে উঠতে পারলে মেয়াদ বাড়ার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু এখন সেই আলোচনাও থেমে গেছে।
তবে নিজের ভবিষ্যৎ নয়, গাত্তুসোর ভাবনা এখন দলকে ঘিরেই। তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের ইতালির কথা বলা উচিত। জাতীয় দলের জার্সির কথা বলা উচিত। আমরা আরও বেশি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম। আর সে কারণেই আমার ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
ইতালির জন্য এখন অপেক্ষা আরও দীর্ঘ। ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত। আর এই সময়টাই বলে দেবে, তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি ইতিহাসের ভারেই আরও চাপা পড়ে যাবে।