চার বছর ধরে জাতীয় দলের বাইরে, একটা দীর্ঘ নীরবতা। সেই নীরবতারই যেন শেষ টানলেন রুবেল হোসেন। হঠাৎ করেই বুধবার (১৫ এপ্রিল) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে জানালেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলছেন তিনি। কোনো বিদায়ী ম্যাচ নয়, আলো ঝলমলে আয়োজন নয়। একটা স্ট্যাটাসেই শেষ হলো এক সময়ের ভয়ংকর ডেথ ওভার স্পেশালিস্টের আন্তর্জাতিক অধ্যায়।
রুবেলের এই ঘোষণায় ক্রিকেট অঙ্গনে তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। সতীর্থ, ভক্ত; সবাই যেন ফিরে গেছে স্মৃতির পাতায়, বিশেষ করে ২০১৫ বিশ্বকাপের সেই ইংল্যান্ড ম্যাচে।
নিজের বিদায়ের বার্তায় রুবেল লিখেছেন, ‘আমি পেসার রুবেল হোসেন। বাংলাদেশের জার্সিতে খেলেছি ২৭ টেস্ট, ১০৪ ওয়ানডে এবং ২৮ টি টোয়েন্টি। জাতীয় দল আমার আবেগ। কিন্তু একটা সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিতেই হতো। সেই চিন্তা করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গুডবাই জানালাম। তবে ঘরোয়া আসরের ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। আমার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, গণমাধ্যমকর্মী ও ভক্তদের ধন্যবাদ। বাকি সময়টাতেও এভাবেই আমাকে আপনাদের পাশে রাখবেন এটা আমার বিশ্বাস। অনেক ভালোবাসা সবার প্রতি।’
এই পোস্টের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় স্মৃতির ঢেউ। অনেকেই মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশের বহু জয়ের পেছনে ছিলেন এই পেসার। বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে তার নার্ভ-ধরা বোলিং ছিল দলের বড় ভরসা।
রুবেলের বিদায়ে আবেগ প্রকাশ করেছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালও। তিনি লিখেছেন, ‘মাঠে ও মাঠের বাইরে, অগণিত স্মৃতি জমে আছে তোমার সঙ্গে। এই যাত্রাটা তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারা সত্যিই গর্বের। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য যা কিছু দিয়েছ, তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। এক অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন, রুবেল।’
২০১৫ বিশ্বকাপের সেই স্মরণীয় মুহূর্ত ভুলতে পারেননি মুশফিকুর রহিমও। তিনি লিখেছেন, ‘এই দিনটি সকল বাংলাদেশির স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। আগামীর দিনগুলোর জন্য রইল শুভকামনা রুবেল।’ জবাবে রুবেল বলেন, ‘অনেক ধন্যবাদ মুশফিক ভাই আপনার জন্য অনেক অনেক দোয়া থাকবে।’
এনামুল হক বিজয় যেন একটু অন্যভাবেই দেখেছেন রুবেলকে। তার ভাষায়, ‘আপনার ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচজয়ী বোলিংটা হয়ত সবাই মনে রাখবে। কিন্তু আমার কাছে রুবেল হোসেন মানেই অসাধারণ কিছু মুহূর্ত, দারুণ সব স্পেল, আর দেশের জন্য জেতানো অনেকগুলো স্মরণীয় ম্যাচ। আপনার সেই হাত তুলে দৌড় এটা শুধু একটা উদযাপন না, এটা ছিল অনুভূতি, একটা গর্ব… যা আমি সবসময় মিস করব। আপনার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় আরও সুন্দর, শান্তিময় আর সফল হোক এই দোয়া রইল।’
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ লিখেছেন, ‘জাতীয় দলে তোমার অবদানের জন্য ধন্যবাদ এবং তোমার অর্জন ও অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য অনেক অভিনন্দন রুবেল হোসেন। তোমার ভবিষ্যৎ কর্মপ্রচেষ্টার জন্য শুভকামনা রইল।’
সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার কথায় উঠে এসেছে মাঠের ভেতর-বাইরের সম্পর্ক, ‘আনন্দময় অনেক সময় কেটেছে তোর সঙ্গে। অ্যাডিলেডে তোর সেই দুটি ডেলিভারি যেমন গোটা দেশকে ভাসিয়েছিল উচ্ছ্বাসের জোয়ারে, তেমনি আরো নানা সময়ে তোর হাত ধরে এসেছে দেশের ক্রিকেটের কিছু স্মরণীয় কিছু সাফল্য। তোর সঙ্গে মাঠের ভেতরে ও বাইরে কত স্মৃতি! আশা করি, তোর জীবনের নতুন অধ্যায় আরো সুন্দর হবে এবং নতুন আঙিনায় আরো সাফল্য তোর সঙ্গী হবে।’
নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটার শরিফুল ইসলামও জানিয়েছেন নিজের অনুপ্রেরণার গল্প, ‘২০১৫ সালের বিশ্বকাপ তখন আমি ছোট ছিলাম, টিভির সামনে বসে আপনার সেই স্পেল দেখছিলাম। কী অসাধারণ। আপনার সেই পারফরম্যান্স আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আজ আপনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন… কিন্তু আপনি যেটা দিয়ে গেছেন, সেটা কখনো শেষ হবে না- অনুপ্রেরণা। আমার সৌভাগ্য হয়েছে আপনার সাথে একই ড্রেসিং রুম শেয়ার করার। আপনার ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা।’ লিটন দাসও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এই পেসারকে।
একটা সময় ছিল, ম্যাচের শেষ ওভার মানেই রুবেলের হাতে বল তুলে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস। আজ সেই অধ্যায় বন্ধ হলেও, তার তৈরি করা স্মৃতিগুলো রয়ে যাবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।