চলমান আন্দোলন ও ধর্মঘটের কর্মসূচির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এতে দেশের আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরের ভেতরে ও বাইরে আটকে পড়েছে হাজার হাজার কনটেইনার ও শতাধিক জাহাজ। সংশ্লিষ্টদের হিসেব অনুযায়ী, কয়েক দিনেই ক্ষতির পরিমাণ পৌঁছেছে শত শত কোটি টাকায়। সামনে পবিত্র রমজান থাকায় নিত্যপণ্য সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে জমে আছে ৪১ হাজারের বেশি টিইইউএস কনটেইনার। এর মধ্যে অধিকাংশই এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোড) যা সরাসরি আমদানি ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত। বন্দরের ভেতরে আটকে আছে প্রায় এক হাজার টিইইউএস রপ্তানি কনটেইনার। বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) পড়ে আছে ১৩ থেকে ১৪ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার। বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতে আরও দেড় হাজার ও কমলাপুর আইসিডিতে পাঠানোর অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় এক হাজার ৭৫০টি কনটেইনার।
সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট তৈরি হয়েছে বন্দরের বহির্নোঙরে। সেখানে অপেক্ষমাণ রয়েছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার, ৫০টির বেশি কনটেইনার জাহাজ ও ১০০টির বেশি বাল্ক ক্যারিয়ার। প্রতিদিন নতুন জাহাজ আসায় বার্থিং শিডিউল সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। শিপিং সংশ্লিষ্টদের হিসেবে, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ প্রতিটি জাহাজের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে।
৬৬ কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্য আটকা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচেম) জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থায় প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আটকে পড়েছে আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্য। এতে দেশের রপ্তানি কার্যক্রম, সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আস্থায় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইউরোচেমের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। কিন্তু বর্তমানে এই কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ।
সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা ও লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে গেলে বাংলাদেশের প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বড় ধাক্কা পোশাক খাতে
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তৈরি পোশাক শিল্প। অনেক ফিডার ভেসেল নির্ধারিত রপ্তানি কনটেইনার না নিয়েই বন্দর ছেড়ে গেছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ ফ্রেট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় আঘাত। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি তো নিরুপন করা খুব কঠিন। আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় আমাদের ওপর সারাবিশ্বের একটা নেগেটিভ ধারণা তৈরি হচ্ছে। এটার একটা ইম্প্যাক্ট পরবে। পার্শবর্তী দেশের সাথে প্রতিযোগীতার বাজারে আমরা টিকে থাকতে পারব না। আস্থার জায়গা নষ্ট হচ্ছে।
ইউরোপ ও আমেরিকায় সময়মতো পণ্য না পৌঁছালে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা অন্য দেশে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
ব্যবসায়ীদের হিসেবে, বন্দরের অচলাবস্থায় বর্তমানে ৫৪ হাজারের বেশি কনটেইনার আটকে রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন কনটেইনারপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। তাদের শত শত কনটেইনার কাঁচামাল বন্দরে আটকে থাকায় পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান রপ্তানি পণ্য সময়মতো জাহাজে তুলতে না পারায় বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
রমজানে নিত্যপণ্য সরবরাহে শঙ্কা
সামনে পবিত্র রমজান থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আমদানি করা খাদ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, খেজুরসহ নিত্যপণ্যের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশে আসে। বন্দরের অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে এসব পণ্যের খালাস বিলম্বিত হবে, যা বাজারে সরবরাহ সংকট ও দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।