ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুই দিনের সফরে ইসরায়েলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে তার এই সফর।
তবে ইসরায়েলে মোদির সফর নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। কংগ্রেস এই সফরকে ‘নৈতিক কাপুরুষতা’ হিসেবে দেখছে।
তারা বলছে, মোদি এমন এক নেতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন, যিনি গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছেন এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছেন।
দেশ ছাড়ার আগে এক বিবৃতিতে মোদি বলেন, ‘আমাদের দেশগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী ও বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে। গত কয়েক বছরে এই সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী জানান, এই সফরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেবেন তিনি।
এ ছাড়া ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন মোদি।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিরক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে নয়াদিল্লি।
গত সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে ভারত-ইসরায়েল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারি তথ্যমতে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।
ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে ১৯৯২ সালে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ২০১৪ সালে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়।
২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন এবং এর পরের বছর নেতানিয়াহু ভারত সফর করেন। ডানপন্থি এই দুই নেতাই একে অপরকে ‘বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করে থাকেন।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের এক বিশাল পরিকল্পনা উন্মোচন করা হয়েছিল।
এর উদ্দেশ্য ছিল রেলপথ, বন্দর, বিদ্যুৎ ও ডেটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশগুলোকে সংযুক্ত করা; যার একটি বড় অংশ যাওয়ার কথা ছিল সৌদি আরব ও ইসরায়েলের ওপর দিয়ে।
তবে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে সেই পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়।
ওই আগ্রাসনে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে; বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি আদানি গ্রুপ বর্তমানে ভূমধ্যসাগরীয় হাইফা বন্দর পরিচালনা করছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের মে মাসে দুই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ ও তেহরানের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে ভারত। ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়নে কাজ করছে তারা; যা আফগানিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবেশদ্বার। সেখানে তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলেছে নয়াদিল্লি।
মোদির সফর ‘নৈতিক কাপুরুষতা’: কংগ্রেস
এদিকে মোদির ইসরায়েল সফর নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দল কংগ্রেস।
কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এক বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেন, মোদি যখন ইসরায়েলের পার্লামেন্টে ভাষণ দেবেন, তখন তিনি গাজায় নিহত হাজার হাজার নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশুর কথা উল্লেখ করবেন এবং তাদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রিয়াঙ্কা লেখেন, ‘ভারত সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং আমাদের সেই পথেই চলা উচিত।’
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য জয়রাম রমেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে ‘নৈতিক কাপুরুষতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, পুরো বিশ্ব যখন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছে, তখন মোদি তার এই ‘প্রিয় বন্ধু’কে নির্লজ্জভাবে আলিঙ্গন করছেন।
জয়রাম রমেশ বলেন, মোদি এমন এক নেতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন, যিনি গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছেন এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছেন।