পাকিস্তান বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে আফগানিস্তানের প্রধান কয়েকটি শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে ইসলামাবাদ ও কাবুলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সীমান্ত উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে।
কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আফগানিস্তান আগে পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এর জবাবে পাকিস্তান আকাশ ও স্থলপথে তালেবানের সামরিক চৌকি, সদর দপ্তর ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
উভয় পক্ষই এই লড়াইয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সরাসরি যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের জঙ্গি আস্তানাগুলোতে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল।
এর আগে গত অক্টোবরেও দুই দেশের সীমান্ত সংঘর্ষে বহু সেনা নিহত হন। পরে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং শত্রুতা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।
প্রতিবেশী দুই দেশ কেন দ্বন্দ্বে লিপ্ত
২০২১ সালে তালেবান যখন পুনরায় আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসে, তখন পাকিস্তান একে স্বাগত জানিয়েছিল। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা ‘দাসত্বের শেকল ভেঙেছে’।
কিন্তু খুব দ্রুতই ইসলামাবাদ বুঝতে পারে, তালেবানরা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সহযোগিতা করছে না।
ইসলামাবাদের দাবি, জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) নেতৃত্ব এবং যোদ্ধারা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্য লড়তে থাকা সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও আফগানিস্তানকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে।
গ্লোবাল মনিটরিং সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছর টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলার পরিমাণ বাড়ছে।
অন্যদিকে, কাবুল বারবার অস্বীকার করেছে, তারা তাদের ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তানে কোনো হামলার অনুমতি দিচ্ছে।
আফগান তালেবানের পাল্টা অভিযোগ—পাকিস্তান তাদের শত্রু সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে; যা ইসলামাবাদ অস্বীকার করে আসছে।
পাকিস্তান বলছে, আফগানিস্তান থেকে ক্রমাগত জঙ্গি হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
এসব কারণে বারবার সীমান্ত বন্ধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে, যা বাণিজ্য ও জনসাধারণের চলাচলকে ব্যাহত করছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে
গত সপ্তাহে বিমান হামলার আগের দিন পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, তাদের কাছে ‘অকাট্য প্রমাণ’ আছে, আফগানিস্তানে থাকা জঙ্গিরাই পাকিস্তানে সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলা ও বিস্ফোরণগুলোর নেপথ্যে রয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে এ পর্যন্ত অন্তত সাতটি পরিকল্পিত বা সফল হামলার সঙ্গে আফগানিস্তানের সংযোগ রয়েছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বাজৌর জেলায় এক হামলায় ১১ জন নিরাপত্তা কর্মী ও ২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন; যেটির দায় স্বীকার করে টিটিপি।
পাকিস্তানি সূত্রমতে, ওই হামলাকারী ছিলেন একজন আফগান নাগরিক।
পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপি কারা
২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সমন্বয়ে টিটিপি গঠিত হয়। এটি সাধারণত পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানে মসজিদ, বাজার, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায় টিটিপি। তারা সীমান্তের অনেক এলাকা এমনকি পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকারও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।
২০১২ সালে মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলার নেপথ্যেও ছিল এই গোষ্ঠী।
টিটিপি একসময় আফগান তালেবানের সঙ্গে মিলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান সরকার সামরিক অভিযান চালালেও স্থায়ী সাফল্য পায়নি। যদিও ২০১৬ সালে এক অভিযানের ফলে কয়েক বছর হামলা অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
সামনে কী হতে যাচ্ছে
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে পাকিস্তান তাদের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে। অন্যদিকে কাবুল হয়তো গেরিলা হামলা বা সীমান্ত চৌকিতে অতর্কিত হামলার মাধ্যমে এর প্রতিশোধ নেবে।
কাগজে-কলমে দুই দেশের সামরিক শক্তির মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে।
আফগান তালেবানের সৈন্য সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার; যা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
তালেবানদের কাছে হাতেগোনা কয়েকটি বিমান ও হেলিকপ্টার থাকলেও তাদের কোনো কার্যকর বিমান বাহিনী বা যুদ্ধবিমান নেই।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের রয়েছে ৬ লাখের বেশি সক্রিয় সেনা, ৬ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান এবং চারশ’র বেশি যুদ্ধবিমান।