ইরানের বিরুদ্ধে আকাশ ও সমুদ্রপথে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যৌথভাবে ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ শুরু করেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের তেহরান, ইস্পাহান, কোম, কারাজ ও কেরমানশাহ— এই পাঁচ শহরে একযোগে হামলা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘অল্প কিছুক্ষণ আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য, ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি থেকে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’
ইরানে আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও সামরিক সংঘাতের মুখে পড়ল এবং তেহরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের বিরোধের কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও সংকীর্ণ হলো।
হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক বিবৃতিতে জানান, ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর থেকে হুমকি অপসারণের জন্য এই ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ চালানো হয়েছে।
তার মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, কাটজ সারা দেশে ‘বিশেষ ও তাৎক্ষণিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আকাশ ও সমুদ্রপথ থেকে এই হামলা চালানো হচ্ছে।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরানে এই অভিযান ‘কয়েক দিনব্যাপী’ চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, এই অপারেশন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে চালানো হচ্ছে।
গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের আকাশ যুদ্ধের পর আজ এই হামলা হলো।
ইরান যদি তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রাখে, তাহলে আবারও হামলা চালানো হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার যে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল, এ তারই প্রতিফলন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আরও জানান, এই অভিযানের পরিকল্পনা কয়েক মাস আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছিল এবং হামলার তারিখ কয়েক সপ্তাহ আগেই নির্ধারিত ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের পর এই ঘটনাকে ‘জায়নবাদী শাসকের আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ফার্স নিউজ এজেন্সি বলছে, তেহরানের কেশভারদুস্ত ও পাস্তুর জেলায় সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবন অবস্থিত।
তবে ইরানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, খামেনি বর্তমানে তেহরানে নেই এবং তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি সাংবাদিকেরা তেহরানে দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং রাজধানীর কেন্দ্র ও পূর্বদিকে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করে আসছে; যদিও ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করে বলেছে, তাদের কর্মসূচি কেবল জ্বালানি উৎপাদনের মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য।
এদিকে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো তাদের কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে এবং মার্কিন নাগরিকদেরও একই পরামর্শ দিয়েছে।
পৃথক বিবৃতিতে দূতাবাসগুলো জানায়, ‘আমরা সব কর্মীর জন্য শেল্টার-ইন-প্লেস (নিরাপদ স্থানে অবস্থান) কার্যকর করছি। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আমেরিকানদেরও নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
ইসরায়েলের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই হামলার পর সরকারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং একসঙ্গেই জয়ী হব। এখানে কোনো সরকারি দল বা বিরোধী দল নেই—শুধু এক জাতি এবং এক আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী)। আমরা সবাই তাদের পাশে আছি।’
হামলার পর ইসরায়েল তাদের আকাশপথ বেসামরিক ফ্লাইটের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মুখপাত্র মাজিদ আখাভান জানিয়েছেন, একাধিক বিস্ফোরণের পর ইরানও তাদের আকাশপথ ছয় ঘণ্টার জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ইরাকের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার কারণে তারাও তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে।
কুয়েত এবং রাশিয়ার বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও ইরান ও ইসরায়েলে তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে এবং বিকল্প রুটে বিমান চলাচলের ব্যবস্থা করছে।
এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব বাড়বে।