ইরানে চলছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা। ইরানি গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাজধানী তেহরানসহ ইস্ফাহান, কোম, কারাজ, কারমানসাহসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কার্যালয়ের কাছেও হামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে চালাচ্ছে পাল্টা হামলা। এর মধ্যেই প্রশ্ন জন্মেছে, এই সংঘাতে মূলত জয়ী হবে কারা। আর এ প্রেক্ষাপটেও সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন—সামরিক শক্তিতে কারা এগিয়ে, ইরান নাকি ইসরায়েল!
জেনে আসা যাক ইরান-ইসরায়েলের সামরিক শক্তির বিস্তারিত—
সেনাশক্তি
ইরানের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার, যার সঙ্গে রয়েছে কয়েক লাখ রিজার্ভ ও আধাসামরিক বাহিনী। সংখ্যার বিচারে এটি অঞ্চলটির বৃহত্তম সামরিক বাহিনীগুলোর একটি। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্তরক্ষা ও অসম যুদ্ধকৌশলে ব্যবহারের জন্য বড় আকারের আধাসামরিক কাঠামোও রয়েছে তাদের। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তেহরানের আছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের স্থায়ী সেনা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। তবে যুদ্ধকালীন সময়ে দ্রুত প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার রিজার্ভ সদস্যকে সক্রিয় করার কাঠামো রয়েছে, যা দ্রুত সম্প্রসারণে সক্ষম একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত।
আকাশশক্তি
ইসরায়েলের বহরে রয়েছে ৬০০টির বেশি বিমান, যার মধ্যে শত শত যুদ্ধবিমান, আক্রমণ হেলিকপ্টার ও বিশেষায়িত নজরদারি বিমান রয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধকৌশল তাদের আকাশশক্তির মূল ভিত্তি। উন্নত যুদ্ধবিমান, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্ল্যাটফর্ম ও আকাশভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তাদের দূরপাল্লার অভিযানে সহায়তা করে।
ইরানের বিমানের সংখ্যা কিছুটা কম এবং অনেক ক্ষেত্রেই পুরোনো মডেলের। তবে তারা ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।০
স্থলবাহিনী
ইরানের হাতে রয়েছে প্রায় ১৭০০ থেকে ২০০০ ট্যাংক, হাজার হাজার সাঁজোয়া যান এবং ১৫০০টির বেশি মোবাইল রকেট লঞ্চার। তাদের স্থলকৌশল গণআক্রমণ ও ব্যাপক গোলাবর্ষণকেন্দ্রিক।
ইসরায়েলের ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান তুলনামূলক কম হলেও তারা গতিশীলতা, উন্নত টার্গেটিং সিস্টেম ও স্বচালিত আর্টিলারির ওপর জোর দেয়। উন্নত সেন্সর ও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে ছোট ইউনিট দিয়েই কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম তারা।
নৌ-ভারসাম্য
ইরানের নৌবাহিনী উপকূলীয় জলসীমা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেয়। সাবমেরিন, দ্রুতগামী আক্রমণ নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত টহল জাহাজ ব্যবহার করে সংকীর্ণ জলপথে ‘সোয়ার্মিং’ কৌশল প্রয়োগের সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ইসরায়েলের নৌকৌশল তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও অত্যন্ত বিশেষায়িত। তাদের সাবমেরিন বহরকে কৌশলগত প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত জাহাজ উপকূল সুরক্ষা ও দ্রুত আঘাত হানায় ব্যবহৃত হয়।
প্রতিরক্ষা ব্যয়
প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইসরায়েল বছরে প্রায় ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যেখানে ইরানের ব্যয় প্রায় ১৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। বড় বাজেটের কারণে উন্নত গবেষণা, প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নে এগিয়ে রয়েছে ইসরায়েল। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে জোর দিয়েছে।
বৈশ্বিক অবস্থান ও কূটনৈতিক মাত্রা
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচকে ইসরায়েলের অবস্থান ১৫তম এবং ইরানের ১৬তম, যা প্রচলিত সামরিক সক্ষমতায় দুই দেশের মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্টের ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতিরিক্ত সামরিক শক্তি, এমনকি বিমানবাহী রণতরী অঞ্চলটিতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা
সাম্প্রতিক হামলা, জরুরি সতর্কতা ও উভয় পক্ষের সামরিক মোতায়েন ইঙ্গিত দিচ্ছে দ্রুত তীব্রতর হওয়া অচলাবস্থার দিকে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষেরই উল্লেখযোগ্য আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা থাকায় সীমিত পাল্টা হামলাও বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এতে আঞ্চলিক শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।