ওয়াশিংটন পোস্ট এক্সক্লুসিভ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে তাদের সামরিক অভিযান শুরুর পর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে হামলায় বহু শিশু নিহত হয়। ওই ভবনটি মার্কিন হামলার তালিকায় ছিল এবং সেটিকে ‘ভুলবশত’ সামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকতে পারে বলে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন এই হামলা সম্পর্কে অবগত একাধিক ব্যক্তি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরে এই প্রাণঘাতী হামলা ঘটে।
হামলার মুহূর্তে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের দ্রুত নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে দুই তলা স্কুল ভবনটিতে তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলেন।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬৮ জন শিশু এবং ৭ জন শিক্ষক।
ভবনটিতে কেন হামলা চালানো হয়েছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে স্কুলে হামলার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ভবনটিকে একটি কারখানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং সেটিকে অনুমোদিত হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় এক ব্যক্তি জানান, একই এলাকায় একটি অস্ত্রাগারও মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র কি তাহলে ভুলবশত স্কুলে আঘাত করেছে, নাকি কর্মকর্তাদের কাছে ভুল গোয়েন্দা তথ্য ছিল যার কারণে তারা ভবনটিকে অস্ত্রাগার মনে করেছিলেন—তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
হামলাটি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় এক ব্যক্তি বলেন, স্কুলভবনটি কেন লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
এ ঘটনায় সামরিক বাহিনীর চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করে ওই ব্যক্তি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি।
ইসরায়েল এই হামলায় কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। দুজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, ওই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুটি হামলার আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সঙ্গে যাচাই বা আলোচনা করা হয়নি।
ওয়াশিংটন পোস্ট এই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ডজনের বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা এই ঘটনা এবং ইরানে সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভূমিকা সম্পর্কে অবগত।
বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
গত বুধবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে বলেছে, পেন্টাগনের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী এবং পুরনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের কারণে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে নিশ্চিত করেছেন, প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, হামলাটি মার্কিন সামরিক বাহিনীই চালিয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ‘ভুলের কারণেই’ সম্ভবত এই ‘ভুল হামলাটি’ হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্র এবং বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্কুলটি একসময় ইরানের একটি নৌঘাঁটির অংশ ছিল; যা ‘হয়তো এখনো ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত’।
তবে ২০১৫ সাল থেকে এটি দেয়াল দিয়ে আলাদা করা ছিল এবং ২০১৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০১৬ সালের শুরুর মধ্যে এর জন্য আলাদা প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের গুগল আর্থের ছবিতে সেখানে একটি উন্মুক্ত খেলার জায়গাও দেখা যায়।
স্যাটেলাইট চিত্র আরও দেখায়, ২০২২ সালে স্কুল চত্বরের বিন্যাস আবারও পরিবর্তন করা হয়। সেবার অতিরিক্ত দেয়াল দিয়ে একটি মেডিকেল ক্লিনিককে আশেপাশের ভবনগুলো থেকে পৃথক করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্কুল ও ক্লিনিকটি আইআরজিসি কম্পাউন্ড-সংলগ্ন বা ভেতরে অবস্থিত হলেও সেগুলো বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই হামলার বিষয়ে যুদ্ধাপরাধের তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মেডিকেল ক্লিনিকে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
গত মঙ্গলবার পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অভিযোগ করেন, ইরানের স্কুলগুলোকে হামলা চালানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
হেগসেথ বলেন, ‘মোল্লারা মরিয়া হয়ে যা তা করছে। কাপুরুষ সন্ত্রাসীদের মতো তারা স্কুল ও হাসপাতাল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে এবং জেনেশুনে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য বানাচ্ছে।’
ইরানিরাই স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে—হেগসেথের এমন দাবির স্বপক্ষে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তার দপ্তর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে মন্ত্রীর ওই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের দিকেই পুনরায় ইঙ্গিত করে।
গত রোববার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হামলার নতুন ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র স্কুলের পাশের একটি ভবনে আঘাত হানছে।
ভিডিওটি পর্যালোচনা করে আটজন গোলাবারুদ বিশেষজ্ঞ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
টমাহক সাধারণত মার্কিন নৌবাহিনী ব্যবহার করে। গত সোমবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইঙ্গিত দেন, ইরান নিজেই টমাহক দিয়ে স্কুলে হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘সেটা ইরান হোক বা অন্য কেউ—আসল কথা হলো টমাহক খুবই সাধারণ একটি জিনিস। এটি অন্য দেশের কাছেও বিক্রি করা হয়।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেগোনা কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ইসরায়েলের অস্ত্রাগারে টমাহক নেই।
আর ইরানের তো নেই-ই।