ইরানি মেটাল শিল্পীর সাক্ষাৎকার
নিজের সঙ্গীত ও লেখালেখির কারণে তেহরানের এভিন কারাগারে ১৮ মাস কাটানোর পর নির্বাসিত জীবনে পা রেখেছেন ইরানের মেটাল সঙ্গীতশিল্পী নিকান খোসরভি। তবে তিনি নীরব হয়ে যাননি।
আউটলুক ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিকান খোসরভি সেন্সরশিপ, প্রতিরোধ এবং কেন দিনকে দিন আরও বেশিসংখ্যক ইরানি যুদ্ধ এবং তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থা—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করছে, তা নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন।
আউটলুক ইন্ডিয়া: আপনার সঙ্গীত জীবন শুরু হয়েছিল কীভাবে? তখন ইরানে শিল্পীদের জন্য পরিবেশ কেমন ছিল?
নিকান খোসরভি: আমার সঙ্গীতের যাত্রা এমন এক সময়ে শুরু হয়েছিল, যখন ইরানি সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত ছিল। মানুষ, আদর্শ, ক্ষমতা—সবখানেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল সীমিত। আমার মতো সত্তাগুলোর জন্য নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ছিল কঠিন সংগ্রাম।
শুরুর দিনগুলোতে আমাদের গান প্রকাশের জন্য কোনো কোম্পানি ছিল না। তাই আমরা ইন্টারনেটের আশ্রয় নিয়েছিলাম। ইউটিউব ও সাউন্ডক্লাউডের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো তখন ইরানে কেবল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সবাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল। আমাদের জন্য এটি কেবল একটি বিকল্প ছিল না, ছিল এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। সেই ডিজিটাল স্বাধীনতা আমাদের কাছে অনেক বড় কিছু ছিল।
ব্যান্ডটি খুব ধীরে ধীরে, অনেকটা পরিকল্পনা ছাড়াই গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল মূলত সেন্সরশিপ, নিয়ন্ত্রণ এবং কণ্ঠরোধ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া। ইরানে মেটাল সঙ্গীতের আগে থেকেই একটি শক্তিশালী আন্ডারগ্রাউন্ড উপস্থিতি ছিল, যার বিদ্রোহী শক্তি আমাদের আলোড়িত করত।
আমরা স্লেয়ার, রেজ অ্যাগেইনস্ট দ্য মেশিন এবং ল্যাম্ব অফ গডের মতো ব্যান্ডগুলোর দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। তাদের গান কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করত। আমরাও আমাদের নিজস্ব উপায়ে সেটিই করতে চেয়েছিলাম। আমরা আমাদের বাস্তবতা, ভয়, নিয়ন্ত্রণ এবং মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গান লিখতাম।
আউটলুক ইন্ডিয়া: ২০১৫ সালে এমন কী ঘটেছিল যা আপনার জীবন বদলে দিয়েছিল?
নিকান খোসরভি: ২০১৫ সালের শেষের দিকে সবকিছু বদলে গেল। আমার ব্যান্ডমেট আরশ ইলখানি এবং আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো। আমাদের গান এবং কথাগুলোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলো। আমাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচারণার অভিযোগ আনা হলো এবং তেহরানের এভিন কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমরা ১৮ মাস কাটিয়েছি বিচারের আশায়, যার ওপর আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছিল।
কারাগার মানুষের সময়ের ধারণা বদলে দেয়। এটি কেবল স্বাধীনতা হারানো নয়; বরং পরিচিত সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
আউটলুক ইন্ডিয়া: বিচারের পর কী হলো?
নিকান খোসরভি: রায়ে আমাদের ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। কিন্তু আমরা জামিন পেতে সক্ষম হলাম এবং সেই মুহূর্তটি আমাদের একমাত্র সুযোগ হয়ে দাঁড়াল। গরাদের পেছনে ১৮ মাস কাটানোর পর আমরা ইরান ছেড়ে নরওয়েতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলাম। যখন আমরা বাইরে পা রাখলাম, জীবন আর আগের মতো রইল না। সবকিছুই ছিল আগের চেয়ে শান্ত, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা শান্তিপূর্ণ ছিল না। সেটি ছিল ভয়ের নিস্তব্ধতা। অনেক মানুষ আমাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করল। কেউ কেউ আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো বিশ্বাস করল। আবার কেউ কেউ আমাদের দেশের শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করল।
আউটলুক ইন্ডিয়া: ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে আপনি কীভাবে দেখেন? সর্বোচ্চ নেতা ও তার শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভগুলোর দাবি আসলে কী?
নিকান খোসরভি: ইরানে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কোনো একক গল্পের চেয়েও বড়। আমাদের অনেকের কাছে এটি একটি সাধারণ ধারণা দিয়ে শুরু হয়েছিল। আমরা একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ চেয়েছিলাম। আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। আমরা যা চেয়েছিলাম তা হলো, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে এবং মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। একটি আশা জেগেছিল যে, প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।
কিন্তু পরিস্থিতি এখন আরও জটিল মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এতে জড়িয়ে পড়ায় প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। তারা সাহায্যের দাবি করলেও আমাদের অবস্থান থেকে বিষয়টি এত সহজ মনে হয় না। মানুষ নিজেদের জন্য যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা এখন বৈশ্বিক স্বার্থ এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের জালে আটকা পড়েছে।
স্বচ্ছতার বদলে এখন কেবল বিভ্রান্তি; ঐক্যের বদলে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। অনেক ইরানির কাছে পরিবর্তনের স্বপ্ন এখন আগের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। তবে ইরানের মানুষ সবসময় যা চেয়ে এসেছে তা খুব সাধারণ—একটি সেক্যুলার দেশ, যেখানে ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা থাকবে; একটি গণতন্ত্র, যেখানে মানুষের কথা বলার সুযোগ থাকবে এবং ভয় ও সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণহীন স্বাভাবিক জীবন।
আউটলুক ইন্ডিয়া: শিল্পী হিসেবে এসব ঘটনা আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
নিকান খোসরভি: একজন শিল্পী হিসেবে এই সময় অত্যন্ত বেদনাদায়ক। গান সবসময়ই ছিল পৃথিবীকে বোঝার এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর আমার নিজস্ব মাধ্যম। আমি যা ঘটছে, তা নিয়ে লেখা চালিয়ে যাচ্ছি—ইরান, সংঘাত এবং এর মানবিক মূল্য নিয়ে লিখছি।
আউটলুক ইন্ডিয়া: এত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আপনি গান তৈরি করছেন?
নিকান খোসরভি: হ্যাঁ, নতুন কিছু গান নিয়ে কাজ চলছে। সেগুলো কেবল আমাদের অতীত নয়, বর্তমান সময়কেও প্রতিফলিত করে। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে আমাদের অনেক শো স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেছে, কিন্তু সঙ্গীতই আমাদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার এবং কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হয়ে রয়েছে।
আউটলুক ইন্ডিয়া: আজকের ইরানকে আপনি কীভাবে দেখেন? ইরানের মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?
নিকান খোসরভি: আমার পরিবার ইরানেই রয়ে গেছে। আমার মা-বাবা তেহরানে থাকেন এবং অন্য অনেকের মতো তারাও প্রতিদিন এক অজানা আতঙ্ক নিয়ে জীবন কাটান। তারা জানেন না, দিনটি তাদের জন্য কী নিয়ে আসবে। আমি যেখানেই থাকি না কেন, সেই অনিশ্চয়তা সবসময় আমার সঙ্গে থাকে। প্রায়ই ভাবি, দেশে ফিরে বাড়িটা একবার দেখে আসব।
ইরানিদের প্রতি আমার বার্তা হলো—শক্ত থাকুন। আপনারা এরই মধ্যে অবিশ্বাস্য সাহস দেখিয়েছেন। সামনের পথ অস্পষ্ট হতে পারে, কিন্তু আশা হারানো উচিত নয়। সংলাপ, বোঝাপড়া এবং পরিবর্তনের দরজা খোলা রাখুন। এখন কঠিন সময়, তবে এই সময় চিরকাল থাকবে না।