চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, সৌদি আরবের কার্যত নেতা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলোকে উৎসাহিত করছেন। ট্রাম্প তাকে মার্কিন প্রচেষ্টার পাশে থাকা একজন ‘যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এমনই ইঙ্গিত দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার জন্য ‘চাপ দিচ্ছেন’ সৌদি যুবরাজ। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনের এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সৌদি যুবরাজ তাকে ইরান সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে উৎসাহিত করছেন কি না।
জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি করছেন। তিনি একজন যোদ্ধা। আর বলে রাখি, তিনি আমাদের সঙ্গেই লড়ছেন।’
প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ ধরে সৌদি যুবরাজ ইরানের কট্টরপন্থী শিয়া শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এই বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে, যুবরাজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেছেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি, যা কেবল বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার মাধ্যমেই নির্মূল করা সম্ভব।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবির সঙ্গে মিলে যায়, যিনি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি মনে করেন।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইসরায়েল তেহরানে দুর্বল বা অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল সরকার মেনে নেওয়ার পক্ষে থাকলেও সৌদি আরব ভয় পাচ্ছে।
রিয়াদের আশঙ্কা, ইরান যদি 'ব্যর্থ রাষ্ট্রে' পরিণত হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করে তুলবে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করবে।
ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল অবস্থান
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র সংকেত দিয়েছেন ট্রাম্প। কখনো তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দেন, আবার কখনো যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর আভাস দেন।
গত সোমবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে শত্রুতা সম্পূর্ণ নিরসনের বিষয়ে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ করেছে। যদিও তেহরান এই দাবি অস্বীকার করেছে।
সৌদি ও মার্কিন সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইরান সৌদি তেলের স্থাপনাগুলোতে আরও বিধ্বংসী হামলা চালাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তহীন যুদ্ধে আটকে যেতে পারে।
যুবরাজের জুয়া
সৌদি যুবরাজ, যিনি ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়নের জন্য পরিচিত, ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং বলা হয়, তিনি অতীতেও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এমবিএস ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো দখল এবং দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেখানে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
সবশেষ খবর অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে কমপক্ষে এক হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সৌদি সরকারের চিন্তাধারা সম্পর্কে অবগত বিশ্লেষকেরা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সৌদি যুবরাজ সম্ভবত যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিলেন। তবে এখন তিনি উদ্বিগ্ন। মার্কিন বাহিনী যদি পিছু হটে, তাহলে সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একাই ‘উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ’ ইরানের মুখোমুখি হতে হবে।
তেমন পরিস্থিতিতে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা পেয়ে যেতে পারে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের অধিকাংশ তেল এই প্রণালী দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ইরানের পাল্টা হামলায় এই পথ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি শিল্পকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি