বিশ্লেষণ
ইরানের ভূখণ্ডে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া এবং এর পাইলটের সন্ধানে নিবিড় তল্লাশি অভিযান নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সেনাকে বন্দি করতে পারলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এটিকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
নিখোঁজ ওই সেনার উদ্ধার অভিযান শনিবার (৪ এপ্রিল) দ্বিতীয় দিনে পড়েছে। সামরিক অভিযান নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন সেনারাই শুধু সর্বাত্মক তল্লাশি চালাচ্ছে না, ইরানের সামরিক বাহিনীও ওই সদস্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
ইরান ওই পাইলটকে খুঁজে পেতে কতটা মরিয়া—তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত এক ঘোষণায়।
টেলিভিশনে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, তারা যেন ‘শত্রু পাইলট বা পাইলটদের’ বন্দি করে জীবিত অবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
ইরানের হাতে ওই সেনার বন্দি হওয়ার সম্ভাবনা ১৯৭৯ সালের ‘ইরান জিম্মি সংকটের’ দুঃসহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
মার্কিন ইতিহাসের সেই মর্মান্তিক ঘটনা প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বৈরি সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
সেই সংকটকালে উগ্রপন্থী শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন আমেরিকানকে ৪৪৪ দিন বন্দি করে রেখেছিল।
এ ঘটনা ইরানের জন্য এমন এক কৌশলের পথ তৈরি করে দেয়, যা পরবর্তী দশকগুলোতে তারা বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হতে, শত্রুদের আঘাত করতে এবং নিজেদের দাবি আদায়ে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেছে।
১৯৭৯ সালের পর থেকে ইরান সরকার বারবার তাদের প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে জিম্মি করার কৌশল ব্যবহার করেছে। তারা মার্কিন, ইউরোপীয় এবং অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের আটক করেছে, কখনো কখনো বছরের পর বছর বন্দি রেখেছে। পরবর্তীতে প্রায়ই বিপুল অর্থ বা বিদেশে আটক ইরানি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ইরান জিম্মিদের প্রোপাগান্ডা এবং দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
১৯৭৯ সালের সেই সংকট জিমি কার্টারের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অনেকের কাছে এটি ছিল তার ব্যর্থতার প্রতীক।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার কার্টারের সেই জিম্মি সংকট মোকাবিলার সমালোচনা করেছেন এবং একে ‘করুণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
১৯৮০ সালে ট্রাম্প এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘এই দেশ হাত গুটিয়ে বসে আছে এবং ইরানের মতো একটি দেশকে আমাদের জিম্মি করে রাখার সুযোগ দিচ্ছে। আমার মতে, এ এক ভয়াবহ ব্যাপার। আমি মনে করি না, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তারা এমনটা করতে পারত।’
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরানের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ইরানে নিখোঁজ সেনাকে বন্দি করতে পারলে তেহরান দুটি পথের যেকোনো একটি বেছে নিতে পারে। যদি বন্দি করার বিষয়টি গোপন থাকে, তাহলে ইরানিরা ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে পর্দার আড়ালে কোনো চুক্তির প্রস্তাব দিতে পারে, যেখানে ওই সেনার মুক্তির বিনিময়ে বড় কোনো ছাড় দাবি করা হতে পারে। অথবা ইরান ওই সেনাকে ক্যামেরার সামনে প্রোপাগান্ডা হিসেবে তুলে ধরতে পারে।’
আজিজি মনে করেন, দ্বিতীয় কৌশলটি নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি বলেন, ‘তারা আসলে বিজয়ের একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে চায় এবং ট্রাম্পকে অপমান করতে চায়।’
ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গাল্ফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো আলি আলফোনেহ ২০০৭ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
সেসময় ইরান ব্রিটিশ নৌসেনাদের বন্দি করে দাবি করেছিল, তারা ইরানি জলসীমায় অনুপ্রবেশ করেছে।
সেই নৌসেনাদের চোখ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। পরে তারা ভিডিও বিবৃতিতে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তবে তাদের শারীরিক কোনো ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানান আলফোনেহ।
তিনি এক ই-মেইল বার্তায় বলেন, ‘তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ তাদের মুক্তির ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক কভারেজ নিশ্চিত করেছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তাদের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন।’
আলফোনেহ বলেন, এবার নিখোঁজ মার্কিন সেনার ক্ষেত্রে আচরণ ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত। এমনকি নিখোঁজ ওই সেনাকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এই ঘটনা বৈরি ভূখণ্ডে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঝুঁকিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।
উদ্ধার অভিযান বিপজ্জনক, কারণ এতে অন্য মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। শুক্রবার তল্লাশিতে অংশ নেওয়া একটি মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার মাটি থেকে ছোড়া গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদিও সেটি নিরাপদে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে।
এ ছাড়া পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি দ্বিতীয় যুদ্ধবিমান এ-১০ ওয়ারথগ বিধ্বস্ত হয়েছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। অবশ্য ওই বিমানের পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ মার্কিন পাইলট ইরানিদের হাতে পড়লে তার পরিণতি কী হতে পারে—সে বিষয়ে ইরানের কর্মকর্তা বা সরকারপন্থী বিশ্লেষকেরা এখন পর্যন্ত খুব কমই মুখ খুলেছেন।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে উপহাস করেছেন।
তিনি লিখেছেন, “টানা ৩৭ বার ইরানকে পরাজিত করার পর, তাদের শুরু করা এই ‘বিচক্ষণ রণকৌশলহীন যুদ্ধ’ এখন ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ থেকে ‘আরে! কেউ কি আমাদের পাইলটদের খুঁজে দেবেন? দয়া করে?’ পর্যায়ে নেমে এসেছে।”
গালিবাফ লেখেন, ‘দারুণ। কী অবিশ্বাস্য অগ্রগতি। অসাধারণ সব প্রতিভা!’
ইয়েগানেহ তোরবাতি দ্য টাইমসের ইরান প্রতিনিধি
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া