এক্সপ্লেইনার
বিশ্ব রাজনীতির গত কয়েক দশকের ইতিহাসে সবচাইতে বড় ও নাটকীয় ঘটনাটি বোধ হয় ঘটিয়ে দিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ১২৯ টন সোনা সরিয়ে প্যারিসে নিয়ে আসার মাধ্যমে তিনি কেবল সম্পদ রক্ষা করেননি, বরং আমেরিকার ‘আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা’র কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের গোয়ার্তুমি আর খামখেয়ালি রাজনীতির জমানায় ডলারের যে প্রতাপ, তা এখন স্রেফ ইতিহাস হওয়ার পথে।
অতীতের সেই সোনালি রীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা ভাবুন। চারদিকে ধ্বংসলীলা, নাৎসি বাহিনীর তান্ডব। নিজের দেশের সম্পদ বাঁচাতে তখন ফ্রান্সের মতো অনেক দেশই তাদের সোনার বিশাল মজুদ পাঠিয়ে দিয়েছিল আটলান্টিকের ওপারে, আমেরিকার নিরাপদ ভল্টে। ১৯৪৪ সালে ‘ব্রেটন উডস’ চুক্তির মাধ্যমে ডলারকে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি করা হয়। নিয়ম ছিল, আমেরিকা যত ডলার ছাপাবে, তার সমপরিমাণ সোনা তাদের ভল্টে মজুত থাকবে। বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে আমেরিকা বলেছিল—সোনা আমাদের কাছে নিরাপদ। সেই থেকে জার্মানি, ইতালি, জাপান এবং ফ্রান্সের মতো প্রায় ৬০টি দেশ তাদের রিজার্ভের বড় অংশ নিউইয়র্কের ভল্টে জমা রেখে আসছে। মূলত নিরাপত্তার খাতিরে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য বজায় রাখতেই এই ‘সোনা জমা রাখার রীতি’র প্রচলন হয়েছিল।
মাখোঁর সেই মাস্টারস্ট্রোক দশকের পর দশক সোনা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকেই পড়ে ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে ভূ-রাজনীতির সমীকরণ। দীর্ঘ ৮০ বছর পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন—আমেরিকার ওপর আর ভরসা নয়, নিজের সম্পদ এবার নিজের ঘরেই ফেরাতে হবে। জুলাই ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬—এই অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে এবং সুকৌশলে নিউইয়র্ক থেকে ১২৯ টন সোনা প্যারিসে সরিয়ে এনেছে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এটি কেবল সাধারণ কোনো স্থানান্তর ছিল না, ছিল এক বিশাল মাস্টারস্ট্রোক। মাখোঁ খুব চতুরতার সঙ্গে নিউইয়র্কের ভল্টে থাকা পুরোনো সোনাগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন এবং সেই টাকা দিয়ে ইউরোপীয় মানের একদম নতুন সোনা কিনেছেন। এর ফলে ফ্রান্সের সমস্ত সোনার মজুদ এখন প্যারিসের নিজস্ব ভল্টে সংরক্ষিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এই অদলবদল করতে গিয়েই ফ্রান্সের লাভ হয়েছে প্রায় ১২.৮ বিলিয়ন ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় অবিশ্বাস্য ১৩৮ ট্রিলিয়ন টাকার সমান।
কেন হঠাৎ এই বিদ্রোহ? কিন্তু কেন এই তড়িঘড়ি? কেন হঠাৎ আমেরিকার ওপর থেকে আস্থা হারালেন মাখোঁ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বর্তমানের টালমাটাল বিশ্ব রাজনীতি আর ডলারের পড়তি দাপটে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ যা করেছেন, তা এক কথায় বিদ্রোহ। তিনি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা এখন আর কোনো নিরাপদ ব্যাংক নয়, বরং এটি একটি ‘চোরের আখড়া’। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আমেরিকা যেভাবে অন্যের রিজার্ভ দখল বা আটকে দেওয়ার নজির দেখিয়েছে, তাতে সারা বিশ্ব আজ আতঙ্কিত। ম্যাক্রোঁ তার উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—‘যদি সোনা আপনার নিজের পকেটে না থাকে, তবে জানবেন ট্রাম্প তা যেকোনো সময় আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেন।’
পেট্রো-ডলারের পতন ও আমেরিকার গুমর এক সময় ডলার ছিল বিশ্বের অঘোষিত সম্রাট। ১৯৭০-এর দশকে যখন আমেরিকা সোনা দিয়ে ডলারের গ্যারান্টি দিতে ব্যর্থ হলো, তখন তারা সৌদি আরবের সাঙ্গে এক চুক্তি করে। নিয়ম হয়, বিশ্বের সব জ্বালানি তেল ডলারে কেনাবেচা হবে। একেই বলা হয় ‘পেট্রো-ডলার’। এই চুক্তির কারণেই আমেরিকা গত ৫০ বছর ধরে বিনা পরিশ্রমে ডলার ছাপিয়ে বিশ্ব শাসন করেছে। কিন্তু সেই যুগ এখন শেষ। চীন, ভারত এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো এখন নিজেদের মুদ্রায় তেল কেনাবেচা শুরু করেছে। এমনকি হরমুজ প্রণালিতে ট্রানজিট ফি হিসেবেও চীনা ইউয়ান ব্যবহারের খবর ডলারের পিঠে বড় আঘাত হিসেবে কাজ করছে।
ভঙ্গুর আমেরিকা ও নতুন মেরুকরণ মাখোঁর এই ‘গোল্ড মুভ’ ডলারের মোড়লিপনায় এক মরণঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। কারণ এখন জার্মানি, ইতালি বা জাপানের মতো দেশগুলোও তাদের সোনা ফেরত চাওয়ার সাহস পাবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনামল যেন আমেরিকার আভিজাত্যকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অন্যদিকে একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে ট্রাম্প নিজেই ডলারকে একঘরে করে ফেলেছেন। ঋণগ্রস্ত আমেরিকান অর্থনীতির এই সংকটময় মুহূর্তে ডলারের মোড়লিপনা টিকিয়ে রাখা এখন প্রায় অসম্ভব।
ইতিহাস বলে, কোনো সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয় তার মুদ্রার পতন দিয়ে। রোমান সাম্রাজ্য বা ব্রিটিশ পাউন্ডের মতো ডলারেরও বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। মাখোঁ কেবল সেই আগুনের শিখাটা উসকে দিয়েছেন। ট্রাম্পের গোয়ার্তুমি আর আমেরিকার জালিয়াতির রাজনীতি তাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখান থেকে ফেরা অসম্ভব। সোজা কথা, ডলারের রাজত্ব শেষ হতে চলেছে, এখন থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু। মার্কিনীদের দম্ভের পতনের এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ডলার তার রিজার্ভ কারেন্সির মর্যাদা হারাতে পারে।