ইসলামাবাদে দীর্ঘ আলোচনার পর কোনো প্রকার চুক্তি ছাড়াই পাকিস্তান ছেড়ে গেছে- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল। এমন অবস্থায় আবারও শঙ্কায় পড়ল, আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে বৈশ্বিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রত্যাশিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি। আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছিল ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে। এদিকে, আলোচনা চলাকালীন হরমুজ প্রণালীতে দুটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা স্পষ্টই যুদ্ধবিরতির আলোচনায় নেতিবাচক উস্কানি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই দেশই বলছে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ইরানকে সর্বোত্তম প্রস্তাব দেয়ার পরই, আলোচনার টেবিল ছেড়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাবগুলো অযৌক্তিক, ফলে তা মেনে নেয়ার সুযোগ নেই। অবশ্য ইরান প্রথম থেকেই, এই আলোচনা যে কোনো ইতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসবে না, তা সম্পর্কে সচেতন ছিল। দেশটি শুরু থেকেই শক্তিশালী অবস্থানে থেকে, আলোচনার টেবিলে যোগ দিয়েছিল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এসেছিল তেহরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে এবং নমনীয় অবস্থানে নিয়ে আসতে। ফলে ব্যর্থ এই আলোচনার প্রথম ধাপে, ইরান যে কিছুটা এগিয়ে আছে তা বললে ভুল হয় না।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইরান যাতে কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। অন্যদিকে ইরান তার আগের দাবি অনুসারে, নিজেদের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ, তবে দেশটি বরাবরই পরমাণু কর্মসূচিকে, বেসামরিক কাজে ব্যবহারের কথা বলে আসছে। একই সঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী, পাশাপাশি ওয়াশিংটন এমন কিছু দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীতে ইরান আরও আলোচনা করতে প্রস্তুত জানালেও দেশটির গণমাধ্যম বলছে তারা আর আলোচনায় আগ্রহী না।
এই আলোচনায় বসার আগেই কাতার এবং অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে জব্দ ইরানের সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমনটা নিশ্চিত হওয়ার পরই ইসলামাবাদে পৌঁছায় ইরানের প্রতিনিধি দল। তবে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে এমনটা অস্বীকার করা হয়। ফলে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় বলাই যাই, সেই অর্থ আবারও অনিশ্চয়তার মুখ দেখল। অন্যদিকে আলোচনা চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো দুটি যুদ্ধজাহাজ হরমুজে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের বাধা দেয় আইআরজিসির নৌবাহিনী, যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে তারা হরমুজে প্রবেশ করতে পেরেছে, তবে তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।
এমন অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল- এখন কী হবে? ট্রাম্প যদিও দাবি করেছেন ইরান চুক্তিতে রাজি না হলেও, বিজয় যুক্তরাষ্ট্রেরই হয়েছে। অন্যদিকে হরমুজে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ প্রবেশের চেষ্টায় স্পষ্টই বুঝা যায় আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই সীমিত হয়ে আসছে। এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে জানান, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে পাকিস্তানে আলোচনা ব্যর্থ হলে, দেশটি নতুন হামলার সম্মুখীন হতে পারে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জানান, ইরান আলোচনার সফলতা ও ব্যর্থতা উভয় পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত আছে। ইরানের এই নেতা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনাগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে, এবার তেহরান বর্তমানে যে দাবিগুলো তুলেছে, তা আগের দাবিগুলোর চেয়ে ভিন্ন। এ সময় তিনি ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক প্রতারণা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ধারাবাহিকতার কথাও মনে করিয়ে দেন। তাছাড়া, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পুরোপুরি অবিশ্বাস’ নিয়েই ইরান আলোচনায় বসছে। অন্যদিকে, আইআরজিসির অভিজাত ইউনিট কুদস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কা’আনি জানিয়েছেন- আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষ ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে, অধিক শক্তিশালী এবং সুসংহত অবস্থানে রয়েছে।
এমন অবস্থায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আবারও মুখোমুখি হলে, ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলার তীব্রতা আরও বাড়াতে পারেন। তবে নিজেদের দাবি অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতির জন্যও যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে তেহরান। এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্টই বলা হয়েছে, মার্কিন হামলার পরও ইরানের হাতে ব্যাপক পরিমাণ আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। ফলে পারস্য উপসাগরে অবস্থান করা মার্কিন বাহিনী ও এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো আগের তুলনায়, আরও ব্যাপক হামলার শিকার হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর, ইরানই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটি ছাড় দিতে কোনো তাড়াহুড়ো করছে না। তেহরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করার এক ভয়াবহ ক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলার ঝুঁকি সত্ত্বেও, তেহরান ভূগোলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, কোনো অবস্থাতেই ইরানকে নমনীয় করা না গেলে, দেশটির ওপর ট্রাম্প নৌ-অবরোধ প্রয়োগ করতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। যার ফলে পূর্বের হুমকি অনুসরণ করে দেশটির খার্গ দ্বীপ দখলের জন্য স্থল অভিযান পরিচালনা করতে পারে পেন্টাগন। কট্টর ট্রাম্পপন্থী বলে পরিচিত লেক্সিংটন ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রেবেকা গ্রান্ট জানান, ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলে, এই প্রণালী দিয়ে কী আসা-যাওয়া করবে আর কী করবে না, তার ওপর মার্কিন নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এক্ষেত্রে খার্গ দ্বীপ বা ওমানের পাশের সংকীর্ণ অংশটি পার হতে চাইলে মার্কিন নৌবাহিনীর অনুমতি নিতে হবে। এই ধারণাটি েবশ পছন্দও করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর তা জানিয়েছেন খোদ তার মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে।
তবে এখানে সমস্যা অন্য জায়গায়, ট্রাম্প মনে করছেন এই যুদ্ধে ইরান একাই লড়াই করছে। তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এরই মধ্যে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা গেছে- চীন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়াও ইরানকে গোপনে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে ট্রাম্পের নৌ অবরোধ যে কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এ ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
তাছাড়া, মার্কিন নৌবাহিনী যদি হরমুজ দিয়ে ইরানের অনুমতি সাপেক্ষে চলাচল করা জাহাজগুলোকে মোকাবেলা করতে চায়- সেক্ষেত্রে চীন, রাশিয়ার পাশাপাশি মার্কিন মিত্র হিসেবে পরিচিত ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজগুলোকেও প্রতিরোধ করতে হবে। যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ওয়াশিংটনকে আরও চাপে ফেলবে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত ইসরায়েল ছাড়া প্রতিটি দেশই চাইছে এই যুদ্ধবিরতি যেন টিকে থাকে। ফলে নতুন করে সংঘাতে ট্রাম্প শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবেন না, এমনটাও ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নৌ অবরোধের ধারণা পছন্দ করার পরপরই, ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে, ট্রাম্প বৈশ্বিক বাজারে মার্কিন জ্বালানী রপ্তানির প্রস্তাবও দিয়েছেন। যার মাধ্যমে, ইরানি অবরোধের কারণে চলমান অস্থিরতা, কমিয়ে আনা যাবে। তবে এক্ষেত্রে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানী বাজারে থাকা হুমকি, কীভাবে কমে আসবে? আর তার কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প যদি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানী রপ্তানি এড়িয়ে শুধু মার্কিন জ্বালানী রপ্তানির ওপর দৃষ্টি দিয়ে থাকেন, তা স্বাভাবিক কারণেই আরব মিত্রদের অসন্তোষ তৈরির কারণ তৈরি করবে। ফলে বলাই যায়, ইসলামাবাদ আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পেছনে ট্রাম্পের গোয়ার্তুমি ওয়াশিংটনকে ইতিবাচক কোনো ফলাফলই এনে দেয়নি বরং ইরানকে বিশ্ব মঞ্চে একটি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রবল চাপের মুখেও কোনো ছাড় দিতে নারাজ।