আকাশে উড়তে থাকা কোটি কোটি টাকা দামের এক একটা মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম, কাঁধে রেখে চালানো যায় এমন এক ছোট্ট ক্ষেপণাস্ত্র, যার নাম ‘ম্যানপ্যাড’। চীন আর ইরানের প্রযুক্তিতে বানানো এই অস্ত্রটা অনেকটা ঝোপের আড়ালে ওত পেতে থাকা এক ক্ষুধার্ত শিকারির মতো। বিড়াল যেমন অত্যন্ত ধৈর্য নিয়ে ইঁদুর ধরার জন্য অপেক্ষা করে, ম্যানপ্যাড হাতে একজন সৈনিকও ঠিক তেমনি নিঃশব্দে অপেক্ষা করেন আকাশের শিকার ধরার জন্য।
একবার ভাবুন তো, আকাশ দাপিয়ে বেড়ানো বিশাল এক দানবীয় স্টিলথ ফাইটার জেট বুক ফুলিয়ে উড়ছে, অথচ মাটির কোনো এক সাধারণ ঝোপের আড়ালে স্রেফ একটা টিউব কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সাধারণ সৈনিক। আধুনিক কোনো রাডার বা দামি যন্ত্র দিয়ে এই সৈনিককে ধরা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু তার হাতের ওই ছোট্ট অস্ত্রটাই অনায়াসে নামিয়ে আনতে পারে আকাশের ওই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাজাকে।
ইরানের তৈরি ম্যানপ্যাড বা কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সাফল্য এখন সামরিক বিশ্বে বেশ আলোচিত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান এবং তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এই ছোট ছোট অস্ত্রের সাহায্যে মার্কিন ও পশ্চিমা প্রযুক্তির শক্তিশালী ড্রোন ও হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেন ও লেবানন সীমান্তে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন এবং ইসরায়েলি ড্রোন ভূপাতিত করতে ইরানের তৈরি উন্নত ম্যানপ্যাড (যেমন: মিসাক সিরিজ) সফলভাবে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে ইয়েমেনে হুথিরা আমেরিকার অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মতো বিশাল ও দামি ড্রোন বেশ কয়েকবার ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যেখানে ম্যানপ্যাডের উন্নত সংস্করণ বা ছোট ছোট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহৃত হয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বর্তমান যুদ্ধে ম্যানপ্যাড প্রমাণ করছে যে দামি প্রযুক্তির ড্রোন বা বিমান থাকলেই আকাশ নিরাপদ নয়; বরং মাটির বুক চিরে উঠে আসা ছোট এক টুকরো ক্ষেপণাস্ত্রই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এই ম্যানপ্যাড মূলত কাজ করে আগুনের নেশায় ছুটে চলা পতঙ্গের মতো। যেকোনো যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন থেকে প্রচণ্ড গরম ধোঁয়া বের হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায় বসানো থাকে বিশেষ এক ‘তাপ সংবেদনশীল চোখ’। যখনই অপারেটর ট্রিগার টেপেন, রকেটের মতো গর্জন করে এটি ছুটে যায় ওই উত্তাপের নেশায়। বিমানটা ডানে গেলে রকেটও ডানে ঘোরে, বামে গেলে বামে। এমনকি পাইলট যদি ক্ষেপণাস্ত্রকে বিভ্রান্ত করতে পাল্টা আগুনের গোলা বা ‘ফ্লেয়ার’ ছোড়েন, তবুও লাভ হয় না। কারণ চীনের বানানো এই আধুনিক সংস্করণের মগজটা খুব ধারালো—সে অনায়াসেই বুঝে ফেলে কোনটা বিমানের আসল ইঞ্জিনের উত্তাপ আর কোনটা স্রেফ ধোঁকা দেওয়ার জন্য ছোড়া নকল আগুনের গোলা।
সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, একে ধ্বংস করার জন্য বিমানের গায়ে সরাসরি ধাক্কা লাগতে হয় না। এটি যখন বিমানের একদম কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখনই ঘটায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ থেকে হাজার হাজার লোহার কুচি বাতাসের বুলেটের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন বা তেলের ট্যাংকি ঝাঁঝরা হয়ে যায়। যে পাইলট একটু আগেও নিজেকে আকাশের অধিপতি ভাবছিলেন, তাকে হয়তো জীবন বাঁচাতে কোনোমতে প্যারাশুট নিয়ে ঝাঁপ দিতে হয়। ইরানের এই অত্যাধুনিক ম্যানপ্যাড আকাশযুদ্ধের সেই পুরোনো নিয়মটাই বদলে দিয়েছে—দামি মানেই অপরাজেয় নয়; মাঝেমধ্যে কাঁধে নিয়ে ঘোরানো ছোট একটা সাধারণ অস্ত্রও হয়ে উঠতে পারে যুদ্ধের ময়দানের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।