যুদ্ধ শুধু গোলাবারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রে হয় না, যুদ্ধ চলে নানা কৌশলেও। আধুনিক এই বিশ্বে বাণিজ্য যুদ্ধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে সেই যুদ্ধ আমেরিকা চালিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। সম্প্রতি নতুন করে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিলে চীনও নড়ে চড়ে বসে। চীন এবার যে অস্ত্র ব্যবহার করছে সেটি নিয়ে কমই আলোচনা হয়েছে। অস্ত্রটির নাম টিপট রিফাইনারি।
চীনের জ্বালানি খাতের এক বিশাল অংশ দখল করে আছে এই ‘টিপট রিফাইনারি’ বা ছোট ও মাঝারি আকারের স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশাল প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় আয়তনে ছোট হওয়ায় এগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘চায়ের কেতলি’ বা টিপট রিফাইনারি বলা হয়। এক সময় শব্দটি কিছুটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতিতে এটি একটি শক্তিশালী পরিভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশেষ করে চীনের শানডং প্রদেশে অবস্থিত এই শোধনাগারগুলো দেশটির মোট তেল আমদানির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে, তখন এই টিপট রিফাইনারিগুলো চীনের জন্য এক বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দেয়। ইরান, রাশিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা দেশগুলো থেকে এরা বড় ধরনের ছাড়ে বা সস্তায় অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। যেখানে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো সরাসরি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে ভয় পায়, সেখানে এই স্বাধীন শোধনাগারগুলো ছদ্মনামে বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেল কেনা অব্যাহত রাখে। এভাবে তারা একদিকে যেমন চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তেমনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে বিশ্বজুড়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
সম্প্রতি ইরান ও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অভিযোগে পাঁচটি টিপট রিফাইনারির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বিধিনিষেধ রুখে দিয়ে চীন একটি কঠোর বার্তা প্রদান করেছে। মার্কিন প্রশাসন এই শোধনাগারগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ আনলেও বেইজিং একে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
চীন সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য করার সার্বভৌম অধিকার তাদের রয়েছে। শুধু মৌখিক প্রতিবাদ নয়, বরং আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে সুরক্ষা দিচ্ছে বেইজিং। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ বা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতির বিরুদ্ধে চীনের একটি বলিষ্ঠ অবস্থান।
এই টিপট রিফাইনারিগুলোর কার্যক্রমের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক নতুন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ইউয়ান বা অন্যান্য বিকল্প পদ্ধতিতে তেলের দাম পরিশোধ করায় বিশ্ব বাণিজ্যে ডলারের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মূলত বৈশ্বিক ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চীন এখন আর কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে নেই। বরং জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা সরাসরি মার্কিন বাণিজ্যিক চাপকে মোকাবিলা করছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন সংঘাতের ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। চীনের এই বাণিজ্য কৌশল নিশ্চিতভাবে ইরান যুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি আধিপত্যকে অনেকটাই কোনঠাঁসা করে দেবে।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স ও এএফপি