রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ বিজয় অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। তার দল তামিলাগা ভেট্টরি কাজাগাম (টিভিকে) প্রথমবার নির্বাচনে লড়েই একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তবে এই অনভিজ্ঞতাই এখন বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যখন তিনি রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের দাবি জানান।
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের দলের একটি ছোট ভুলই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একক বৃহত্তম দল হিসেবে প্রথমে দাবি জানাতে হয় এবং এরপর রাজ্যপাল তাদের সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। এরপর বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হয়।
তামিলনাড়ুর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কোনো দলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। নির্বাচনে দুই বছরের পুরনো দল টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে। তবে বিজয়ের নিজের জেতা দুটি আসনের একটি ছেড়ে দিতে হবে বলে কার্যকরভাবে তাদের আসন সংখ্যা ১০৭।
২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। অর্থাৎ টিভিকে এখনো ১১টি আসন দূরে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস তাদের ৫ জন বিধায়ক নিয়ে বিজয়কে সমর্থন দেয়।
এতে টিভিকে জোটের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১১২।
টিভিকের ভুলটি যেখানে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজয়ের ভুলটি ছিল ৬ মে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের কাছে জমা দেওয়া চিঠিতে। সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে দেওয়া সেই চিঠিতে তিনি টিভিকে বিধায়কদের পাশাপাশি কংগ্রেস বিধায়কদেরও স্বাক্ষর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
নিয়ম অনুযায়ী, বিজয়ের উচিত ছিল, প্রথমে কেবল তার দলের ১০৮ জন বিধায়কের তালিকা জমা দেওয়া। এতে একক বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে তার অবস্থান সুসংহত হতো।
কিন্তু কংগ্রেস বিধায়কদের নাম শুরুতেই যুক্ত করায় তিনি পরোক্ষভাবে একটি কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে বসেন।
এই কারণেই সম্ভবত রাজ্যপাল তাকে ফিরিয়ে দেন এবং ১১৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষরসহ (যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা) পুনরায় আসতে বলেন।
রাজ্যপালের সঙ্গে দ্বিতীয় বৈঠকটিও ফলপ্রসূ হয়নি।
রাজভবন থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিজয় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত কুমার সিন্ধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, ‘বিজয় যদি একক বৃহত্তম দল হিসেবে দাবি জানাতেন, তাহলে তা অনুমোদিত হতো।’
এক্সে অন্য এক সাংবাদিক লিখেছেন, ‘বিজয়ের যদি আরও ভালো রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন উপদেষ্টা থাকত, তাহলে আজই তিনি শপথ নিতে পারতেন।’
প্রকৃতপক্ষে বিজয়ের বয়স ৫১; এটিই তার প্রথম নির্বাচন। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তার দলের লড়ার অভিজ্ঞতা নেই।
টিভিকে বিধায়কদের গড় বয়স ৪৪ বছর। বিজয়ের দলে অভিজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম হলেন কে এ সেঙ্গোট্টাইয়ান। নয়বারের এই বিধায়ক ২০২৫ সালে নিখিল ভারত আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগামে (এআইএডিএমকে) ছেড়ে টিভিকেতে যোগ দেন।
বিজয়ের পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত
প্রশ্ন উঠেছে, বিজয়কে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ না জানিয়ে রাজ্যপাল কি ঠিক করেছেন? অনেক দলই অভিযোগ করেছে, বিজেপিশাসিত কেন্দ্রের চাপে রাজ্যপাল এমনটা করছেন।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের ভিন্ন মত রয়েছে।
জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট নিরাজ কিষাণ কাউল বলেন, সংবিধানে এর কোনো নির্দিষ্ট ধরাবাঁধা নিয়ম নেই এবং অনুচ্ছেদ ১৬৩ অনুযায়ী কাকে সরকার গঠনে ডাকা হবে, সে বিষয়ে রাজ্যপালের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা রয়েছে।
তিনি বিখ্যাত ‘এস আর বোম্মাই বনাম ভারত সরকার’ মামলার উদাহরণ টেনে আনেন, যেখানে রাজ্য সরকারকে খামখেয়ালিভাবে বরখাস্ত করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
তবে কাউল উল্লেখ করেন, ঝুলন্ত বিধানসভার ক্ষেত্রে এই রায় কোনো চূড়ান্ত সমাধান দেয়নি। তিনি ১৯৮৮ সালের সারকারিয়া কমিশন এবং ২০১০ সালের পুঞ্চি কমিশনের সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন।
সারকারিয়া কমিশন প্রথমে প্রাক-নির্বাচনী জোট, তারপর একক বৃহত্তম দল এবং শেষে নির্বাচন-পরবর্তী জোটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল।
আর পুঞ্চি কমিশন বলেছিল, রাজ্যপাল সেই দল বা জোটকে ডাকতে পারেন, যাদের পক্ষে ‘সর্বাধিক সমর্থন’ রয়েছে। তবে এই সুপারিশগুলো এখনো আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়নি।
তামিলনাড়ুর সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাটগি জোর দিয়ে বলেন, রাজ্যপাল সাংবিধানিকভাবে প্রথমে একক বৃহত্তম দলকে ডাকতে বাধ্য।
কংগ্রেস সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট অভিষেক মনু সিংভিও একই মত পোষণ করেন।
তিনি বলেন, যখন অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জোট আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানায়নি, তখন রাজ্যপালের সামনে বিজয়কে ডাকা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।
বর্তমানে জোর গুঞ্জন চলছে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ও এআইএডিএমকে হাত মেলাতে পারে। এখন সবার নজর রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকারের দিকে। তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে এখন তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।