মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর পর গত তিন মাসে ইরান অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিসির অনুসন্ধানী ইউনিট ‘বিবিসি ভেরিফাই’। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ওয়াশিংটন যতটা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, বাস্তবে ক্ষতি তার চেয়েও অনেকগুন বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানোর পরই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর থেকেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পরিকল্পিত ওই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো।
বিবিসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব হামলায় অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, নজরদারি অবকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, সেনা সদস্যদের থাকার স্থান এবং বাঙ্কারেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে থাকা কয়েকটি মার্কিন প্রতিরক্ষা স্থাপনা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটির মূল্য শত কোটি ডলারেরও বেশি। একটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দামই কোটি কোটি ডলার। ফলে হামলার আর্থিক প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে থাকা কিছু জ্বালানি পরিবহন ও নজরদারি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর সেখানে আগুন এবং ধোঁয়ার চিহ্নও ধরা পড়েছে। কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজানেও একাধিকবার হামলার প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির পাশাপাশি তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুও জানিয়েছে, ইরানের পাল্টা আঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি ছিল। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ২০টি মার্কিন স্থাপনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছু বিশ্লেষক সেই সংখ্যা ২৮ পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করছেন।
একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও। তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইরানের হামলায় শতাধিক সামরিক অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাডার, বিমান এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বড় যে যুদ্ধের শুরুতে কয়েকটি ঘাঁটি থেকে সেনা সদস্যদের সরিয়েও নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে পেন্টাগন এখনো দাবি করে আসছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত অভিযানে তারা ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে এবং তেহরানের সামরিক সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ সেই দাবির বিপরীতে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ইরান শুধু পাল্টা হামলাই চালায়নি, বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোতেও দৃশ্যমান ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ এখনো বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক ঘাঁটি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঘিরে পরিস্থিতি এখনো অস্থির।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। আগে বড় সামরিক ঘাঁটিগুলোকে প্রায় অজেয় মনে করা হতো। এসব ঘাঁটিতে হামলা তো দূরের কথা, এসবের ওপর দিয়ে ‘কাক-পক্ষী উড়ে’ যেতে পারতো না বলে দাবি করা হতো। কিন্তু তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন শক্তিশালী সামরিক অবকাঠামোকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোকে তাদের সামরিক কৌশল নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি ভেরিফাই, আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, মিলিটারি ডটকম, দ্য জেরুজালেম পোস্ট, দ্য ডেইলি বিস্ট, মানিকন্ট্রোল, এওএল নিউজ