অবশেষে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান সম্ভবত পবিত্র জিলহজ মাসের শেষ দিকে এবং মহররম মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে তেহরান প্রশাসন।
তেহরান মিউনিসিপ্যালিটির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়ক উপ-প্রধান মোহাম্মদ আমিন তাভাকোলিজাদেহ ইরানের মেট্রোপলিটন শহরগুলোর ৫২তম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কমিশনের বৈঠকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো, যখন খামেনির মৃত্যুর তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও তার জানাজা ও দাফন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্ন উঠছিল। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব দাফন সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। বিশেষ করে শিয়া মুসলিম সমাজে ধর্মীয় নেতাদের মরদেহ দীর্ঘদিন দাফন ছাড়া রাখা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ফলে খামেনির দাফন বিলম্বিত হওয়া শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় খামেনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর ইরান সরকার প্রথমে ৪ মার্চ তেহরানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিশাল জানাজার আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল। রাজধানীর ইমাম খোমেনি মোসাল্লা কমপ্লেক্সে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেটি স্থগিত করা হয়।
সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, প্রত্যাশিত বিপুল জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আরও সময় প্রয়োজন। তবে সময় যত গড়িয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়েছে যে বিষয়টি শুধু জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
ফার্স্টপোস্ট, ব্লুমবার্গ, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস, ইরান ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, খামেনির মৃত্যুর সময় ইরান এক অভূতপূর্ব সংকটের মধ্যে ছিল। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত, সামরিক স্থাপনায় হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রাণহানি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে অস্থিরতা, সব মিলিয়ে তেহরান কার্যত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
এ অবস্থায় কোটি মানুষের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রীয় জানাজা আয়োজন করলে তা নতুন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল নজিরবিহীন।
দাফন বিলম্বের আরেকটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে উত্তরাধিকার ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন। ১৯৮৯ সাল থেকে টানা কয়েক দশক ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি শুধু রাজনৈতিক নয়, সামরিক, ধর্মীয় ও কৌশলগত সিদ্ধান্তেরও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করার কাজ শুরু হয়। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, দাফন অনুষ্ঠানকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল ইরানের নতুন নেতৃত্ব। তাই রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে দেওয়া হয়।
এই দীর্ঘ সময় মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছিল, সে বিষয়ে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরদেহ বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সংরক্ষণের স্থানও গোপন রাখা হয়েছিল।
কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমদিকে তেহরানের একটি নিরাপদ সরকারি স্থাপনায় মরদেহ রাখা হয়েছিল। পরে সম্ভাব্য দাফনস্থলের প্রস্তুতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটি বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় সংরক্ষিত ছিল।
দাফনস্থল নিয়েও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ছিল। শুরু থেকেই আলোচনা চলছিল, খামেনিকে তার জন্মস্থান মাশহাদে সমাহিত করা হবে। বিশেষ করে শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান ইমাম রেজা মাজার কমপ্লেক্সের আশপাশে তাকে দাফনের প্রস্তাব ব্যাপক গুরুত্ব পায়। তবে এপ্রিল পর্যন্তও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, চূড়ান্ত স্থান নির্ধারণ করা হয়নি। সাম্প্রতিক ঘোষণার পর ধারণা করা হচ্ছে, দাফনস্থল সংক্রান্ত জটিলতাও অনেকটাই কেটে গেছে।
ইরানের ইতিহাসে এ ধরনের নজির খুব কম। ১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় লাখো মানুষ অংশ নিয়েছিল। ভিড়ের চাপে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দাফন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল কয়েক ঘণ্টার ঘটনা। অন্যদিকে খামেনির ক্ষেত্রে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে দাফন বিলম্বিত হওয়া আধুনিক ইরানের ইতিহাসে কার্যত নজিরবিহীন।
বিশ্ব ইতিহাসে দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের উদাহরণ রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা ভ্লাদিমির লেনিন, চীনের মাও সেতুং এবং ভিয়েতনামের হো চি মিনের মরদেহ আজও সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। তবে মুসলিম বিশ্বে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। কারণ ইসলামী ঐতিহ্যে দ্রুত দাফনকে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এখন তেহরানের নতুন ঘোষণার ফলে ধারণা করা হচ্ছে, শোক ও স্মরণের প্রতীক হিসেবে মহররম মাসের আবেগঘন পরিবেশকে সামনে রেখে খামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। শিয়া মুসলিমদের কাছে মহররম আত্মত্যাগ, শোক ও স্মরণের মাস। ফলে এই সময়কে বেছে নেওয়ার মধ্যেও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বার্তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তিন মাসের বেশি সময় ধরে যে প্রশ্নটি বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছে, ‘কেন এখনো দাফন করা হয়নি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে?’ তার উত্তর হয়তো এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। নিরাপত্তা, রাজনীতি, ক্ষমতার রূপান্তর, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং প্রতীকী রাষ্ট্রীয় আয়োজন, এসব কিছু মিলিয়েই আধুনিক ইরানের সবচেয়ে আলোচিত এবং ঐতিহাসিক জানাজা অনুষ্ঠানের মঞ্চ প্রস্তুত করা হলো।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট, ব্লুমবার্গ, রয়টার্স, এএফপি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ইরান ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস, দ্য ইকোনমিক টাইমস, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, নিউইয়র্ক পোস্ট, মিডল ইস্ট আই, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, আল জাজিরা ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম