যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকে সইয়ের জন্য বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক জায়গা বেছে নেন, যেখানে প্রায় ১০৭ বছর আগে অন্য এক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এক দুর্ভাগ্যজনক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, সেই চুক্তি ওই প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক পতন ডেকে এনেছিল এবং পরবর্তীতে অ্যাডলফ হিটলারের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।
এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানিয়েছে, ১৯১৯ সালের ২৮ জুন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটাতে জগদ্বিখ্যাত ফরাসি রাজপ্রাসাদ প্যালেস অব ভার্সাইয়ে ‘ভার্সাই চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র দেশ ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের উপস্থিতিতে হওয়া এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে জার্মানি ও তার সহযোগীদের সঙ্গে চলা চার বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটায়।
তবে ওই চুক্তি তৈরির শুরু থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। আলোচনার মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণের পরিবর্তে তা জার্মানির ওপর একপ্রকার জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
যার মধ্যে ছিল, যুদ্ধ শুরুর সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করা, ২৬ হাজার বর্গমাইলেরও বেশি ভূখণ্ড হারানো, প্রায় ৫০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া, সব উপনিবেশের অধিকার ত্যাগ করা এবং সামরিক বাহিনীর আকারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়া।
চুক্তি সম্মেলনে অংশ নেওয়া জার্মানির প্রতিনিধিরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এক সপ্তাহের মধ্যে মিত্রবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের হুমকির মুখে পড়েই কেবল তারা ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে হিটলার জার্মান জনগণের মনে এই চুক্তির প্রতি জমে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নিজের জনসমর্থন বাড়ান। আর ক্ষমতা দখলের পর তিনি ভার্সাই চুক্তিকে পুরোপুরি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে জার্মানির সামরিক বাহিনীকে নতুন করে পুনর্গঠিত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ওই চুক্তিতে উইলসনের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল লিগ অব নেশনস (জাতিসংঘের পূর্বসূরি) প্রতিষ্ঠা করা। তবে এটি মার্কিন কংগ্রেস এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র বিরোধিতার জন্ম দেয়।
তাদের আশঙ্কা ছিল, এর ফলে মার্কিন বাহিনীকে আবারও দূরদেশের কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে।
এ কারণে ১৯১৯ এবং ১৯২০ সালে মার্কিন কংগ্রেসে ভার্সাই চুক্তি অনুমোদনের প্রচেষ্টা পরপর দুবারই ব্যর্থ হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই চুক্তির ভাগ্য চিরতরে ভেস্তে যায়।
পরবর্তীতে ১৯২১ সালে ওয়াশিংটন জার্মানির সঙ্গে একটি পৃথক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
সেসময় ভার্সাই চুক্তি পাসের পক্ষে জনমত গড়তে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারে নেমেছিলেন প্রেসিডেন্ট উইলসন। তবে ১৯১৯ সালের গ্রীষ্মে প্রায় ১০ হাজার মাইলেরও বেশি পথ ভ্রমণের চরম ধকল শেষ পর্যন্ত তার শরীর সইতে পারেনি।
সে বছরের ২ অক্টোবর তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং প্রেসিডেন্ট মেয়াদের বাকিটা সময় পুরোপুরি অসুস্থ ও কর্মক্ষমতাহীন হয়ে কাটান।