ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বুধবার বিকেলে নিজের ফ্ল্যাটে ছিলেন সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার। হঠাৎ চারপাশ তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে।
সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বিবিসি মুন্দোকে তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে জানালাগুলো দুলছিল। নিজেকে বাঁচাতে প্রধান দরজা আর পাথরের দেয়ালটার মাঝখানে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসছিল না।’
এদিন ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চলে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথমটি ছিল ৭ দশমিক ২ এবং দ্বিতীয়টি ৭ দশমিক ৫ মাত্রার।
বিভিন্ন ছবিতে ধসে পড়া ভবন এবং রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখা গেলেও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো জানা যায়নি।
কোলস্টার বলেন, ‘এটি আমার জীবনে অনুভূত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। কম্পন এতটাই তীব্র ছিল, আমার মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটি বুঝি আমার ওপর ভেঙে পড়বে।’
ভূমিকম্পের সময় ভবনের সপ্তমতলার ফ্ল্যাটে প্রধান দরজা ও পাথরের দেয়ালের মাঝে কোলস্টার ‘বেশ কিছু সময়’ ধরে ছিলেন। পরে প্রতিবেশীদের ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান শুনে বাইরে যান।
কারাকাসের কেন্দ্রস্থলে অভিজাত এলাকা প্যালোস গ্রান্দেস। এটি ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি।
সেখানকার বাসিন্দা কোলস্টার বলেন, ‘ভূমিকম্পের এক ঘণ্টা পরও সবাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। যদি আফটারশক (পরাঘাত) হয়, সেই ভয়ে কেউ ভেতরে ঢুকছিলেন না।’
গতকাল ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা সিমন বলিভারের ঐতিহাসিক কারাবোবো যুদ্ধ জয়ের স্মরণে জাতীয় ছুটি ছিল। এ কারণে ভূমিকম্পের সময় অনেক মানুষই বাড়িতে ছিলেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে আসা ছবি ও ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, রাস্তায় নেমে আসা মানুষের কেউ কাঁদছেন, আবার কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
কোলস্টার বলেন, ‘অনেকে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন। প্রিয় পোষা প্রাণীটিকে সঙ্গে করে বের করতে না পারায় এক ধরনের অসহায়ত্ব কাজ করছিল তাদের মধ্যে।
‘অন্যরা আফটারশকের ভয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই ভবনের বেসমেন্ট থেকে নিজেদের গাড়িগুলো বের করার চেষ্টা করছিলেন। কাছেই একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে মানুষের বাঁচার আকুতিও শোনা যাচ্ছিল।’
প্যালোস গ্রান্দেসের আরেক বাসিন্দা মারিয়া এলিস জানান, ভূমিকম্পে তার ফ্ল্যাটের কিছু দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে।
বিবিসি মুন্দোকে তিনি বলেন, ‘বাইরের বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ভেঙে পড়েছে। আমাদের এখানে কোনো বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের নেটওয়ার্কও নেই।’
ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানার ঘটনা এবারই প্রথম নয়।
এর আগে ১৯৬৭ সালে কারাকাসে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ২ শতাধিক মানুষ নিহত হন। সেসময়ও প্যালোস গ্রান্দেস ও উচ্চবিত্তদের এলাকা আলতামিরার বহু ভবন ধসে পড়ে।
তবে ১৯৬৭ সালের সেই ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তাদের মতে, বুধবারের কম্পনটি ছিল আরও অনেক বেশি শক্তিশালী।
পূর্ব কারাকাসের ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা কোরো মার্তিনেজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘বিকট একটা শব্দ হয়েছিল। ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র, ফ্রিজে থাকা জগ সব আছড়ে পড়েছিল। আমি জীবনে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি।’
৮০ বছর বয়সী পেনশনভোগী মারিয়া রোমেরো বলেন, ‘এই ভূমিকম্পটি ছিল ভয়াবহ, এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ।’