প্রতিদিন চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানোর পর যে চুলগুলো আপনি ধুলোবালির সঙ্গে ডাস্টবিনে ফেলে দেন, তা যে লাখ লাখ ডলারের হতে পারে, একসময় তা ভাবাই যেত না। মানুষের ধারণা ছিল, ঝরে যাওয়া চুলের মূল্য ওই ডাস্টবিন পর্যন্তই।
তবে দিন বদলেছে। বাজারে এখন নিজের চুল বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে। চুলের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বেশ ভালো অঙ্কের অর্থও মিলছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া আজ শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চুলের এই পুরো বাণিজ্যটি আবর্তিত হচ্ছে মূলত দুটি দেশকে কেন্দ্র করে, ভারত এবং চীন। সীমান্তে এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যতই বিরোধ থাকুক না কেন, ব্যবসার টেবিলে বসলে তারা যেন সব ভুলে এক হয়ে যায়।
ফেলে দেওয়া চুল থেকে পরচুলা
চীনের হেনান প্রদেশের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে জুচ্যাং শহর; যাকে বলা হয় বিশ্বের ‘পরচুলার রাজধানী’।
সেখানে চুলের ব্যবসা আধুনিক কোনো ব্যবসা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শহরের বাসিন্দারা চুল নিয়ে কাজ করে আসছেন।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই শিল্প আরও শক্তিশালী হয়ে বৈশ্বিক বাজারের শীর্ষস্থান দখল করেছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা ছোট কর্মশালাগুলোকে ধীরে ধীরে একত্রিত করে বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে রেবেকা হেয়ার, যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম পরচুলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
জুচ্যাং শহরে মানুষের চুলকে ডাকা হয় ‘কালো সোনা’ নামে। এখানে রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে লম্বা ও সুস্থ চুল, যা এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল, তা চড়া দামে বিক্রি হয়। এই কাঁচামালের খোঁজে ক্রেতারা বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ান।
সংগ্রহ করা চুলগুলোকে দৈর্ঘ্য, রঙ এবং গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা করা হয়। চুল যত বিরল ও উন্নত মানের হয়, তার দামও তত বাড়ে। একটি ভালো মানের প্রাকৃতিক চুলের পরচুলার দাম একজন কর্মজীবীর পুরো এক মাসের বেতনের সমানও হতে পারে।
এককালে পরচুলা ছিল কেবল অভিজাতদের ফ্যাশন এবং ক্ষমতার প্রতীক। রাজা-বাদশা ও বিচারকেরা সমাজে নিজেদের সম্মান ও সমীহ আদায় করতে এটি পরিধান করতেন।
এখন এটি কেবল ফ্যাশন, সৌন্দর্য ও বিনোদন জগতের অনুষঙ্গই নয়, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের কারণেও অনেকের কাছে এটি নিত্যদিনের ব্যবহারের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছে।
কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা
চীনের জুচ্যাংয়ে গড়ে ওঠা হাজার হাজার কর্মশালা ও কারখানা নিয়ে একটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে, যেখানে বিশ্বের সিংহভাগ পরচুলা ও হেয়ার এক্সটেনশন তৈরি হয়।
এই ইকোসিস্টেমে চুল সরবরাহকারী, রঙ করার কারখানা, পরচুলা জোড়া লাগানোর কর্মী ও রপ্তানিকারকেরা সবাই কাছাকাছি কারখানায় অবস্থান করেন।
এর ফলে উৎপাদন খরচ যেমন কমে, তেমনি কাজের গতিও বহুগুণ বেড়ে যায়; যা পৃথিবীর অন্য কোথাও এখনো সম্ভব হয়নি।
তবে চীনের এই বিশাল শিল্পের মূল চালিকাশক্তি তার প্রতিবেশী দেশ ভারত।
অনেকেরই হয়তো জানা নেই, পরচুলা এবং হেয়ার এক্সটেনশন তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ভারতীয়দের চুল।
চীনে চুল বিক্রির প্রবণতা দিনকে দিন কমে আসায় সেখানকার স্থানীয় শিল্প সম্পূর্ণভাবে এখন আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলির মতে, জুচ্যাংয়ের অনেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এখন ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের মতো দেশ থেকে চুল কেনা শুরু করেছে।
মজার ব্যাপার হলো, এই খাতের সবচেয়ে বড় চীনা কোম্পানিটি দাবি করেছে, তাদের ব্যবহৃত চুলের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে ভারত থেকে।
ভারতে শ্রমিকেরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নারীদের ফেলে দেওয়া জটলা পাকানো চুলগুলো ছাড়িয়ে সোজা করেন। এরপর লম্বায় অন্তত ৬ ইঞ্চির বেশি চুলগুলোকে আলাদা করে বল তৈরি করেন।
ভারতের এই চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সিংহভাগই অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গে। দেশের মোট মানব চুল রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই আসে এই রাজ্য থেকে।
এভাবেই ভারতের এক প্রান্ত থেকে কুড়িয়ে পাওয়া চুলের গোছা দেশের সীমানা ডিঙিয়ে চলে যায় চীনে। সেখানে এগুলোকে চূড়ান্তভাবে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হয় আকর্ষণীয় পরচুলা, যা পরে বিক্রি হয় বিশ্ববাজারে।
জার্মানিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে এই চুল রপ্তানি শিল্পের বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ৭০ কোটি ডলার।