ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে দেশটির অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় স্থান মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.) মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ তার জানাজা ও শেষ বিদায়ে অংশ নেন। তবে তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। শুক্রবার (১০ জুলাই) ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে দাফনের মধ্য দিয়ে এক সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠান, শোকযাত্রা ও সমাবেশের সমাপ্তি ঘটল। উল্লেখ্য, এটি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জন্মশহর।
এর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দফাতেই নিহত হন খামেনি। এরপর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
বৃহস্পতিবার মাশহাদের জনাকীর্ণ সড়ক দিয়ে ট্রাকে করে খামেনির মরদেহ ইমাম রেজা (আ.) মাজারের দিকে নেওয়া হয়। দুই পাশে সাদা পাগড়ি পরা আলেমরা হেঁটে যান। কালো পোশাক পরা হাজারো শোকাহত মানুষ ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি ও বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত লাল প্ল্যাকার্ড হাতে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
ইরান ও ইরাকে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগম নিশ্চিত করতে দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব জনগণকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এর মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শক্তি ও আদর্শিক ঐক্য প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও ইরান রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও ইরান এখনো গুরুতর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে। পাশাপাশি ৩৭ বছরের শাসনামলে আলী খামেনির উত্তরাধিকার নিয়েও দেশজুড়ে মতভেদ রয়েছে।
‘ট্রাম্পকে হত্যা করো’ স্লোগান
মাশহাদে জানাজার শোভাযাত্রার অপেক্ষায় থাকা জনতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দেন। অনেককে ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করতেও দেখা যায়। সন্ধ্যায় মাজার প্রাঙ্গণে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। লাউডস্পিকারে শোকসংগীত ও ধর্মীয় সুরের মধ্যেই হাজারো মানুষ প্রতিবাদী স্লোগান দিতে থাকেন।
পরে একটি হেলিকপ্টারে খামেনির কফিন জনসমুদ্রের ওপর দিয়ে মাজারের ভেতরে নেওয়া হয়। তার বড় ছেলে মোস্তফা খামেনি জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। এরপর ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনটি মাজারের ভেতরে বহন করা হয়। অনেক শোকাহত মানুষ মোমবাতি হাতে কফিনের দিকে হাত বাড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, শুক্রবার ভোরে আলি খামেনি ও তার সঙ্গে নিহত পরিবারের আরও চার সদস্যের দাফন হয়েছে।
শিয়া বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থানে সমাহিত
ইমাম রেজা (আ.) শিয়া ইসলামের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ইমাম। তার মাজার কমপ্লেক্স ইরানের মাশহাদে অবস্থিত ও এটি শিয়া মুসলমানদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান। এর আগে খামেনির মরদেহ তেহরান, কোম এবং ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হয়। প্রতিটি শহরেই বিপুল মানুষ শোকযাত্রায় অংশ নেন।
শিয়া ধর্মতত্ত্বে শাহাদাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিদেশি হামলায় খামেনির মৃত্যু সেই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জনসমক্ষে নেই মোজতবা খামেনি
খামেনির মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর মার্চের শুরুতে ধর্মীয় পরিষদের সিদ্ধান্তে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। লিখিত বিবৃতি দিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও প্রকাশ করা হয়নি।
তেহরানের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। তার মুখমণ্ডল বিকৃত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন ও সুস্থ হয়ে উঠলেও এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। নিরাপত্তাজনিত কারণেও তাকে প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স