আরাবল্লীকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন পাহাড় বললে ভুল হবে, এটি আড়াই বিলিয়ন বছরের পুরোনো এক প্রাকৃতিক প্রাচীর। একসময় যে পর্বতমালা মেওয়ার অঞ্চলকে বহিরাগত শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে, আজ অবাধ খননে সেই প্রাচীর নিজেই বিপন্ন। আর এর সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে রাজস্থানের সাধারণ কৃষকদের।
প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ২.৫ থেকে ৩.৫ বিলিয়ন বছর পুরোনো আরাবল্লী বিশ্বের প্রাচীনতম ভঙ্গিল পর্বতমালাগুলোর একটি। প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে তাম্র যুগের আহার-বানাস সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছিল এই পাহাড়ের কোলেই। মধ্যযুগে এই দুর্গম পাহাড়ি পথ ও কুম্ভলগড়ের ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাপ্রাচীর রাজপুতদের বহিরাগত আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রেখেছিল। ভীল ও গরাসিয়া আদিবাসীদের সাহায্যে এই ভূখণ্ড ব্যবহার করেই মহারানা প্রতাপ মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
মরুভূমির আগ্রাসন রুখে দেওয়া এক ‘মহাপ্রাচীর’
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাইরে আরাবল্লীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এর পরিবেশগত ভূমিকা। ভূতাত্ত্বিক ড. এ কে গ্রোভারের গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তৃত এই পর্বতমালা থর মরুভূমির রুক্ষ বালিকে পূর্ব দিকে গঙ্গা সমভূমিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। উর্বর কৃষিজমিকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি এটি ভারতের একটি অন্যতম প্রধান জলবিভাজিকা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বর্তমানে পাহাড় কেটে অবাধ ও অবৈধ খননকাজের ফলে এই ভূতাত্ত্বিক রক্ষাকবচ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিপন্ন ‘রাজস্থানি কানেকশন’ ও কৃষকের হাহাকার
জয়পুর, কিষাণগড় বা সিকারের কৃষকদের কাছে এটি শুধু পরিবেশ বাঁচানোর তাত্ত্বিক লড়াই নয়; এটি তাদের রুটিরুজি ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। পাহাড় কেটে ফেলার কারণে আরাবল্লীতে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তার মধ্যদিয়ে থর মরুভূমির বালি এখন সরাসরি ধেয়ে আসছে উর্বর খামারগুলোর দিকে। চোখের সামনেই সবুজ খেতগুলো পরিণত হচ্ছে অনুর্বর বালির টিলায়।
ভারত সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ২৬ মিলিয়ন হেক্টর জমি মরুকরণ ও অবক্ষয়ের শিকার। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্থানের এই অঞ্চলে। ইতোমধ্যেই এখানকার কৃষিজ উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কৃষকদের কাছে এটি এখন নিজেদের ভিটেমাটি এবং খাদ্য নিরাপত্তা বাঁচানোর আর্তনাদ। রাজস্থানের কৃষিজমি ও জনজীবনকে রক্ষা করতে হলে আড়াই বিলিয়ন বছরের পুরোনো এই প্রাকৃতিক প্রাচীরটিকে বাঁচানোর কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র
১. ড. এ কে গ্রোভারের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা প্রতিবেদন - লিংক
২. ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘ডিজার্টিফিকেশন অ্যান্ড ল্যান্ড ডিজার্টেশন অ্যাটলাস’ প্রতিবেদন