ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর এর দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে সাধারণ মার্কিনিদের জীবনে। পেট্রলপাম্পে, বিমানবন্দরে এবং পারিবারিক ব্যয়ের হিসাবে বাড়তি খরচের চাপ টের পাচ্ছেন তারা।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় খুচরা মূল্য ছিল ৪ দশমিক শূন্য শূন্য ৬ ডলার। অর্থাৎ, জ্বালানির দাম রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ৪ ডলারের সীমার আশপাশেই রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগের পূর্বাভাসের সঙ্গে তুলনা করলে এই মূল্যবৃদ্ধি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। জানুয়ারিতে ইআইএ পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ৬ শতাংশ কমবে।
তবে সর্বশেষ পূর্বাভাসে সংস্থাটি চলতি বছর প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৩ দশমিক ৭৮ ডলার হতে পারে বলে জানিয়েছে। ২০২৫ সালে যা ছিল ৩ দশমিক ১০ ডলার।
সরকারি মূল্যস্ফীতির তথ্যেও জ্বালানি খাতে এই বড় ধাক্কার চিত্র উঠে এসেছে।
তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সির আজ শুক্রবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইয়ে পেট্রলের দাম কিছুটা কমলেও এক বছর আগের চেয়ে তা ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি ছিল। একই সময়ে সামগ্রিক জ্বালানি মূল্য ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএলএস)।
যুদ্ধ শুরুর আগে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। জুলাইয়ে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে অঞ্চলভেদে এর প্রভাবের তারতম্য রয়েছে। যেমন ওয়াশিংটন মেট্রোপলিটন এলাকায় পেট্রলের দাম এক বছর আগের চেয়ে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় বেড়েছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
চাপ কেবল পেট্রলপাম্পেই সীমাবদ্ধ নেই
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ব্যয়ের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে চালকেরা পেট্রলপাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই এর প্রভাব শেষ হয়ে যায় না।
পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত খাবারসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়ে যায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে শুল্ক, সরবরাহ সংকটসহ আরও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণও ভূমিকা রাখছে। তাই সব ধরনের মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু ইরান যুদ্ধকে দায়ী করা ঠিক হবে না।
বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। বিএলএসের বিমানভাড়া সূচক অনুযায়ী, জুলাইয়ে বিমানভাড়া এক বছর আগের চেয়ে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ছিল।
এদিকে জুলাইয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে জেট জ্বালানির প্রতি গ্যালনের স্পট মূল্য গড়ে ছিল ৩ দশমিক ৪০ ডলার, যা জানুয়ারির চেয়ে প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি।
তবে উড়োজাহাজের সংকট, ভ্রমণের উচ্চ চাহিদা, আসনসংখ্যার সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়ও বিমানভাড়ায় প্রভাব ফেলছে।
ফলে মার্কিন পরিবারগুলোর কাছে ইরান সংঘাত এখন কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, ক্রমেই একটি অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিই সম্ভবত ব্যাখ্যা করে কেন গতকাল বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সংঘাত মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
এদিন ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের এক নম্বর লক্ষ্য, দেশজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম কম রাখা। ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে, সেটি দ্বিতীয় লক্ষ্য।’