ইরানে বিক্ষোভ আরও বড় আকার ধারণ করছে। বিক্ষোভ সামাল দিতে বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর হামলায় বাড়ছে হতাহতের ঘটনা। এ পর্যন্ত ১২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে কোনো কারণে বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হলে তথা সরকার পতনের ঝুঁকির মুখোমুখি হলে রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৬ বছর বয়সী খামেনি যদি মনে করেন যে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হচ্ছে, আদেশ মানছে না বা দলত্যাগ করছে, তাহলে তিনি তেহরান ত্যাগ করবেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রায় ২০ জন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরিবারের সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে দেশ ছাড়তে পারেন।
একটি গোয়েন্দা সূত্র দ্য টাইমসকে জানিয়েছে, এই বিকল্প পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যান বি’–তে খামেনির ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী মোজতবা খামেনিও অন্তর্ভুক্ত। সূত্র মতে, এটি কেবল একজন নেতার নয়, বরং পুরো ঘনিষ্ঠ বলয়ের নিরাপদ প্রস্থানের প্রস্তুতি।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কর্মরত সাবেক কর্মকর্তা বেনি সাবতি বলেন, খামেনির সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো। তার মতে, ‘খামেনির জন্য এখন আর খুব বেশি নিরাপদ আশ্রয় নেই’। তিনি জানান, এই পরিকল্পনা অনেকটাই সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পালানোর ছক অনুসরণ করে তৈরি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিরোধী বাহিনী দামেস্কে অগ্রসর হওয়ার আগে আসাদ পরিবারসহ মস্কোতে পালিয়ে যান।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, খামেনির ঘনিষ্ঠ মহল তেহরান ছাড়ার জন্য আগেই একটি নিরাপদ পথ প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশে সম্পত্তি কেনা, নগদ অর্থ মজুত এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
খামেনির সম্পদের একটি বড় অংশ ইরানের প্রভাবশালী আধা-রাষ্ট্রীয় দাতব্য সংস্থা ‘সেতাদ’-এর অধীনে পরিচালিত বলে জানা যায়। ২০১৩ সালে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, আয়াতুল্লাহ খামেনির নিয়ন্ত্রণাধীন সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমি, আবাসন ও বিভিন্ন কোম্পানি।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানিসহ খামেনির অনেক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর পরিবারের সদস্যরা ইতোমধ্যেই বিদেশে বসবাস করছেন। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই।
এদিকে, তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গত এক সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পবিত্র শহর কোমসহ রাজধানী তেহরানেও ব্যাপক প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বাসিজ মিলিশিয়া, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত দাঙ্গা–নিয়ন্ত্রণ বাহিনী বিক্ষোভ দমনে তাজা গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করছে।
এই নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সরাসরি খামেনির নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব রাখেন। ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি বিশেষভাবে আইআরজিসির ওপর নির্ভরশীল।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি এবং দ্য টাইমসের পর্যালোচিত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল অনুযায়ী, খামেনি সাধারণত অনুগতদের রক্ষা করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও নিরাপত্তা নিজ হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে তার শাসনব্যবস্থায় দলত্যাগ সহজ নয়। তবে একই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
সম্প্রতি চলমান বিক্ষোভের সময় খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি বা তার কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি। যুদ্ধের সময় তিনি একটি বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং শীর্ষ আইআরজিসি কর্মকর্তাদের মতো প্রাণহানি এড়িয়ে যান। প্রোফাইলে খামেনিকে একজন আদর্শবাদী হলেও বাস্তববাদী নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ‘তিনি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের জন্য কৌশলগত আপস করতে প্রস্তুত। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই তার কাছে প্রধান।’
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনি আজারবাইজান-তুর্কি বংশোদ্ভূত এক ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠেন। শৈশবে তিনি কবিতা, ফার্সি, পাশ্চাত্য সাহিত্য এবং সংগীতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। টলস্টয় ও স্টেইনবেকের মতো লেখকদের বই পড়তেন তিনি।
ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলে খামেনি বিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত হন। সে সময় সাভাক গোপন পুলিশ তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করে। ১৯৮১ সালে একটি হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারান।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই হত্যাচেষ্টাই ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান এবং শাসনব্যবস্থা রক্ষাকে ‘ঐশ্বরিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখার মানসিকতা আরও দৃঢ় করে।