ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে বইছে অস্থিরতার ঝড়। যে মানুষটি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন, তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন বিশ্ব শান্তিতে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন একে দিচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় কমান্ডো অভিযান, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি এবং দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতের ওপর অভাবনীয় শুল্কারোপ—সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মনে এক বড় প্রশ্ন, ট্রাম্প তো নতুন মেয়াদে ক্ষমতায় এসে পুরো বিশ্বকে উলটপালট করে দিচ্ছেন। তবে কি তিনি অবলীলায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করছেন?
নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের মাধ্যমে অপহরণ করার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়। কোনো স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বকে তোয়াক্কা না করে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার এই নীতি লাতিন আমেরিকায় উত্তেজনার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল মাদুরোকে সরানো নয়, বরং ওই অঞ্চলের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি আগ্রাসী চেষ্টা। রাশিয়ার মিত্র হিসেবে পরিচিত ভেনেজুয়েলায় এই হামলা মস্কোকেও উস্কে দিতে পারে।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার জেদ কেবল ‘রিয়েল এস্টেট’ প্রেম নয়, বরং এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল। ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলের চাবিকাঠি। ডেনমার্কের অসম্মতি সত্ত্বেও সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রচ্ছন্ন হুমকি ন্যাটোর ভেতর বড় ধরনের বিভেদ তৈরি করেছে। যদি মার্কিন বাহিনী গ্রিনল্যান্ডে কোনো জোরপূর্বক অবস্থান নেয়, তবে তা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ডেনমার্কের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে গণ্য হবে। আর নিজের মিত্রদের ওপর আঘাত হানার এই নীতি ন্যাটো জোটের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘোষণা করতে পারে।
ট্রাম্পের বাণিজ্যিক আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ ভারতও। ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কারোপ করার সিদ্ধান্ত নয়াদিল্লির জন্য বড় এক ধাক্কা। ট্রাম্পের যুক্তি, আমেরিকানরা দীর্ঘকাল ধরে অন্য দেশের কাছে ঠকছে, এখন সময় হয়েছে প্রতিশোধ নেওয়ার। এই শুল্ক যুদ্ধের ফলে কেবল ভারত নয়, বরং চীন ও ইউরোপীয় দেশগুলোও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ কার্যত বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখন আর কেবল পরমাণু বোমা বা প্রথাগত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তিনটি ফ্রন্টে লড়া হচ্ছে:
সীমানা লঙ্ঘন: ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যু।
অর্থনৈতিক অবরোধ: ভারত ও চীনের ওপর চড়া শুল্কারোপ।
জোট ভাঙন: ন্যাটোর ভেতরে অবিশ্বাস এবং ইউরোপীয় মিত্রদের থেকে আমেরিকার দূরত্ব।
ট্রাম্পের এই ‘একলা চলো’ নীতি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য সবার বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধে নামে, তবে তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে অন্যান্য শক্তিগুলো (রাশিয়া, চীন, ইরান) ঐক্যবদ্ধ হবে। পাল্টা অ্যাকশনে যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও মহান বানানোর স্বপ্নে বিভোর ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন তিনি কেবল দর কষাকষি করছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা নয়। এখানে একটি ছোট ভুল পদক্ষেপ পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সংঘাতের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে। ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত শান্তি রক্ষাকারী হিসেবে নিজের নাম লেখাবেন, নাকি তার এই জেদ বিশ্বকে এক মহাপ্রলয়ের দিকে ঠেলে দেবে—সময়ই তা বলে দেবে।