পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে বরাবরই বানানা স্টেট হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য তার এই পরিচিতি। দেশটি আবারও এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। একদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবন্দি দশা ও স্বাস্থ্যের চরম অবনতি, অন্যদিকে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলা এবং ভেঙে পড়া অর্থনীতি—সব মিলিয়ে দেশটি এখন একটি আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৬ সালের শুরুতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা। আদিয়ালা জেলখানায় দীর্ঘ সময় বন্দি থাকার ফলে তার চোখের দৃষ্টির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। সর্বশেষ মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী, তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি মাত্র ১৫ শতাংশ অবশিষ্ট আছে। ‘সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন’-এর কারণে তার চোখে রক্ত জমাট বেঁধেছে, যা জেলখানায় চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।
ইমরান খানের সুচিকিৎসার দাবিতে শুধু পিটিআই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলের ১৪ জন কিংবদন্তি অধিনায়ক (যার মধ্যে ভারতীয় ক্রিকেটারও রয়েছেন) পাকিস্তান সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছেন। ইমরান খানকে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং তার মুক্তির দাবি এখন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং বিশ্বব্যাপী একটি বড় মানবিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে। বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) দেশটির বিভিন্ন স্থানে সমন্বিত হামলা চালাচ্ছে। ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিকামী বাহিনীর হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় হামলা। রাজধানী ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন শহরে আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত আক্রমণ বেড়েছে, যা রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে বুঝা যাচ্ছে, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জন্য ২০২৬ সালটি এসেছে এক দুঃস্বপ্ন হয়ে।
এদিকে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং আইএমএফের কঠিন শর্তাবলীর কারণে মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট দেশটিকে বারবার খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
আছে বেকারত্ব ও প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতির কারণে জনজীবনে স্থবিরতার চিত্র। জনজীবনে নেমে এসেছে দারিদ্র, যা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালছে।
এমন উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেও ক্রিকেটের প্রতি আবেগ পাকিস্তানে স্তিমিত হয়নি। ভারত-পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনা থাকলেও, মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতি এখন অনেক বেশি প্রভাবশালী। সাবেক ক্রিকেটারদের ইমরান খানের পাশে দাঁড়ানো প্রমাণ করে, রাজনীতি ও খেলাধুলা সেখানে সমান্তরালে বইছে।
পাকিস্তানের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে পাকিস্তান একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কানাগলিতে আটকে গেছে। সেনাবাহিনী ও বর্তমান সরকারের নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা এবং ইমরান খানের বিশাল জনসমর্থনের মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইমরান খানের মুক্তি ও একটি স্বচ্ছ জাতীয় সংলাপ ছাড়া পাকিস্তানের এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের পথ আপাতত দেখছেন না দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।