চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলাকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, ইরান ঘিরে সমুদ্র ও আকাশে নজিরবিহীন শক্তিবৃদ্ধি করেছে পেন্টাগন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে এই বিশাল রণপ্রস্তুতিকে আরমাডা বা যুদ্ধজাহাজের শক্তিশালী বহর হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সপ্তাহের শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প।
এক প্রতিবেদনে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, সেই সময়ের তুলনায় এবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্য ততটা স্পষ্ট নয়।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই নৌবহরে রয়েছে বিমানবাহী রণতরি আব্রাহাম লিংকন। এর সঙ্গে আছে তিনটি যুদ্ধজাহাজ, যেগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত। গত জুনে ইরানের দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সময় এই জাহাজগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।
যুদ্ধজাহাজগুলোতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে। রণতরিতে থাকা অত্যাধুনিক স্টিলথ এফ-৩৫ এবং এফ/এ-১৮ আক্রমণকারী বিমানগুলো ইরানের ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো নাগালে রয়েছে; যদি ট্রাম্প সেগুলোকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন।
আক্রমণাত্মক শক্তি আরও বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নৌবাহিনীর সবচেয়ে উন্নত রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং এর সহযোগী তিনটি ডেস্ট্রয়ার।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা করা জাহাজ ও বিমান ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) এগুলো জিব্রাল্টার প্রণালীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
উল্লেখ্য, গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের সময় ফোর্ড-এর যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।
মার্কিন এক নৌ-কর্মকর্তার মতে, উত্তর আরব সাগরে আরও একটি ডেস্ট্রয়ার পাঠানো হয়েছে এবং আরেকটি পথে রয়েছে। ফলে ওই বিস্তৃত অঞ্চলে মোট ডেস্ট্রয়ারের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১৩টি।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমান ঘাঁটি মার্কিন বিমান শক্তির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অন্তত দুটি ধাপে সেখানে আক্রমণকারী বিমান পৌঁছানো হয়। ঘাঁটিতে বিমানের সংখ্যা এখন প্রায় ৩০।
আক্রমণকারী বিমানের পাশাপাশি জানুয়ারির শেষে জর্ডানে চারটি ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার জেট পৌঁছেছে, যা রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা জ্যাম করতে ব্যবহৃত হয়। ৩০ জানুয়ারির একটি স্যাটেলাইট ছবিতে ওই ঘাঁটিতে অন্তত পাঁচটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন দেখা গেছে।
বিমান ট্র্যাকিং ডেটা এবং স্যাটেলাইট ইমেজ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) বিমান এবং অত্যাধুনিক সেন্সর ও ক্যামেরাসমৃদ্ধ গোয়েন্দা বিমানসহ আরও আকাশযান মোতায়েন করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাহিনীকে রসদ সরবরাহের জন্য ডজন ডজন ট্যাঙ্কার এবং কার্গো বিমান সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সরিয়ে আনা হয়েছে।
পেন্টাগন ইরানের কাছাকাছি অঞ্চলে অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট এবং থাড বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠিয়েছে, যাতে ইরানি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে মার্কিন সেনাদের রক্ষা করা যায়।
বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলো, যেগুলো ইরানে আঘাত হানতে সক্ষম, সেগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প যখন সামরিক বিকল্প চেয়েছিলেন, তখনই পেন্টাগন এই সতর্কবার্তা জারি করে।
এরপর থেকে ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটিতে বেশ কিছু স্পেশাল অপারেশন, নজরদারি এবং রিফুয়েলিং বিমান পাঠানো হয়।
এই ঘাঁটি মূলত দূরপাল্লার বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমানের অগ্রবর্তী মোতায়েনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।